ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা
ইরানে চলমান যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট সংকটে এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, এই চরম অস্থিরতার মধ্যেই সোলার প্যানেল, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে চীন।
চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিশাল অগ্রগতি
চীন ইতিমধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই খাতের প্রয়োজনীয়তাকে আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক স্যাম রেনল্ডস উল্লেখ করেন, 'ইরান সংঘাত চীনের জ্বালানি উন্নয়ন ও ভূরাজনীতি নিয়ে নেওয়া পদক্ষেপকে পুরোপুরি বৈধতা দিয়েছে।' এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের লি শুও মনে করেন, এই ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্য যেকোনও দেশের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানি নীতির দুর্বলতা উন্মোচিত
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র যখন 'ড্রিল, বেবি, ড্রিল' নীতির মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানিতে জোর দিচ্ছিল, ইরান যুদ্ধ সেই নীতির দুর্বলতা স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অ্যামি মায়ার্স জাফে ব্যাখ্যা করেন, 'এই জ্বালানি ধাক্কা বৈশ্বিক বাজারে চীনা শিল্পকে সহায়তা করবে এবং আমেরিকার গাড়ি শিল্পকে বড় আঘাত করবে।'
চীনা প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদায় রেকর্ড বৃদ্ধি
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর চীনা প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত ডিসেম্বরেই সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যান রফতানি রেকর্ড ২২.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৭ শতাংশ বেশি। হংকংয়ের শেয়ারবাজারে চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি ও সিএটিএলের শেয়ারের দামেও উল্লম্ফন ঘটেছে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বিকল্প খোঁজা
জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এখন বিকল্প খুঁজতে ব্যস্ত। যুক্তরাজ্যের অক্টোপাস এনার্জি জানায়, মার্চ মাসে বৈদ্যুতিক গাড়ি লিজিংয়ের চাহিদা এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সোলার প্যানেল বড় রক্ষাকবচ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রিনিউয়েবলস ফার্স্টের নাবিয়া ইমরান বলেন, 'সোলার না থাকলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিত।' ধারণা করা হচ্ছে, সোলার ব্যবহারের ফলে আগামী এক বছরে পাকিস্তান ৬.৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারবে।
ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের অবস্থান
অন্যদিকে, কয়লা রফতানিকারক দেশ ইন্দোনেশিয়াও এখন বৈদ্যুতিক যানের দিকে ঝুঁকছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এই খাতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। চীনা কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ার ক্লিন এনার্জি সাপ্লাই চেইনে ৫৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। ভিয়েতনামের বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা ভিনফাস্ট জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে বিশেষ ছাড় দিচ্ছে। অরোরা রিসার্চের প্যাট্রিক ট্যান মনে করেন, ক্রেতারা আপাতত যুদ্ধের ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির উচ্চমূল্য বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।



