মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হয়েছিল যুদ্ধবিরতির খবরে। বিশ্ব জুড়ে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। তবে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ফলাফলশূন্যভাবেই শেষ হওয়ায় আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিতেও আলোর দেখা মেলেনি। বরং অবস্থাদৃষ্টে এ সংকটের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হবে বিশ্ব জুড়ে—বিশ্লেষকরা মনে করছেন এমনটাই।
জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক ধাক্কা
বর্তমানে যে নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তা যদি আগামী দিনগুলোতে টেকসই শান্তিচুক্তিতে রূপও নেয়, তার পরও এই ধাক্কার রেশ কাটবে না শিগিরই। ব্রুয়ারির শেষ দিকে, তথা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর আগ মুহূর্তে, বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে যে পূর্বাভাস শোনা গিয়েছিল, তা তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল; কিন্তু আজকের বাস্তবতা বেশ খানিকটা ভিন্ন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান এরূপ অবস্থাকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাসংকট' বলে অভিহিত করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তারা আশঙ্কা করছেন যে, এই সংকটের চ্যালেঞ্জ আছড়ে পড়বে বহু দূর অবধি।
বিশ্ব অর্থনীতি এখন বিপদমুক্ত নয়। বরং যুদ্ধবিরতি চুক্তি আলোরমুখনা দেখায়বিপদ আরো বাড়তে পারে স্বাভাবিকভাবেই। বিশেষ করে, জ্বালানি তেলের দাম অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকেরা এসব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করবেন নিঃসন্দেহে।
ঐতিহাসিক উদাহরণ ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত দুই দশকের বিভিন্ন জ্বালানিসংকটের দিকে তাকালে দেখা যায়, এ ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা কীভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন অর্থনীতিতে সাধারণত ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়ে গেছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৭ সালের মার্চ থেকে ২০০৮ সালের জুন পর্যন্ত—সাবপ্রাইম ঋণসংকটের আগের অর্থনৈতিক উত্থানের সময়—তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলার থেকে বেড়ে ১৪০ ডলারে পৌঁছে যায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা মূল্যসূচক ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে উঠে যায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশে। এই মূল্য বৃদ্ধিই ২০০৮ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার সূচনা ঘটায়, যা ছিল ‘লেহম্যান ব্রাদার্স ধস' এবং ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক বিপর্যয়ের মাস কয়েক আগের ঘটনা।
একইভাবে, ২০১০ সালের মে থেকে ২০১১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চীনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময় তেলের দাম ৭৪ ডলার থেকে বেড়ে হয় ১১৩ ডলার। এ সময় মূল্যসূচক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। এরপর ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের মে পর্যন্ত—রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের ঠিক আগে ও পরে- তেলের দাম ৬৬ ডলার থেকে বেড়ে ১১৪ ডলারে উঠে যায়। এর ফলে মূল্যসূচক ৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশে।
বর্তমান জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও স্ট্যাগফ্লেশন আশঙ্কা
এরূপ একটি ধারাবাহিকতায়, গত দেড় মাসে আবারও তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে যেখানে ছিল ৬২ ডলার, এখন তা বেরেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্বের অনেক দেশে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর আশঙ্কা বেড়েছে; অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি একসঙ্গে দেখা দিচ্ছে। অবশ্য বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে কি না, তার ওপর। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালি কতদিন আংশিক বা পুরোপুরি অবরুদ্ধ থাকে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার হুংকার দিয়েছে, পালটা হুংকার এসেছে তেহরানের পক্ষ থেকেও।
অনিশ্চয়তা বহাল থাকায় বেশ কয়েকটি পূর্বাভাসকারী প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সতর্ক সংকেত দিয়েছে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস জানিয়েছে, যদি বৈশ্বিক তেলের গড় দাম মাস দুয়েকের মতো সময় ধরে ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে থাকে, তাহলে বিশ্বের কিছু অংশে মৃদু মন্দা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, ব্ল্যাকরক জানিয়েছে, ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠলে সংকট ব্যাপক ঘনীভূত হবে। অবশ্য এখনো ধারাবাহিকভাবে এমন উচ্চমূল্যে তেল পৌছায়নি। তবে ইরান মনে করছে যে, তারা অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে এবং এ কারণে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টিকরাই তাদের কৌশল। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকলে তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত ঠেলে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তেহরান।
আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ও মুদ্রানীতি
উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ৩২টি প্রধান অর্থনীতির সমন্বয়ে জরুরি মজুত থেকে ঐতিহাসিকভাবে বড় পরিসরে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পরও গত দেড় মাসে তেলের দাম বেড়েছে। সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলো এর আগে মাত্র পাঁচ বার জরুরি তেলের মজুত ব্যবহার করেছে—১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০৫ সালের হারিকেন ক্যাটরিনা, ২০১১ সালের লিবিয়া যুদ্ধ এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর দুই বার।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট যে বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হলো, সাম্প্রতিক মুদ্রানীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড—সবই গত মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। যদিও প্রত্যাশা ছিল, সুদ হার কমে আসবে। এর পাশাপাশি বাজারের ক্রমবর্ধমান একটি অংশ এখন মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন যে, তারা আর এ বছর যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার কমানোর সম্ভাবনা দেখছে না। এমনকি ব্যবসায়ীরা ২০২৬ সালে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধির সম্ভাবনাও মূল্যায়নে ধরছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের ফলে যে অর্থনৈতিক অভিঘাত শুরু হয়েছে, তা বিশ্বব্যাপী আসন্ন নির্বাচনগুলোকে ক্ষমতাসীন দলগুলোর জন্য আরো কঠিন করে তুলবে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। এমনকি সিনেটও কাঁপছে এই আশঙ্কায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার অর্থনৈতিক প্রভাব হবে ‘খুবই সামান্য’। তবে সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত বহু দেশ এই মতের সঙ্গে একমত নয়। এমনকি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররাও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।
ইসলামাবাদ সংলাপ ব্যর্থ হওয়ায় যুদ্ধের আশঙ্কা আরো বেড়ে গেছে। উভয় পক্ষের পালটাপালটি হামলায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে তা কোনদিকে মোড় নেয়, বিশ্বের চোখ এখন সেদিকেই। তবে বিশ্ব অর্থনীতি যে আগামী দিনগুলোতে টালমাটাল হয়ে পড়বে, তা একপ্রকার নিশ্চিত!
লেখক : সহযোগী গবেষক, এলএসই আইডিয়াস, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস
আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : সুশৃৎ খান সুজন



