এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক পূর্বাভাস
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) তাদের সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪.০ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রতিবেদনটি শুক্রবার (১০ এপ্রিল) প্রকাশ করা হয়, যেখানে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক উন্নতি ও সম্ভাব্য কারণ
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার পর, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এটি বেড়ে ৪.০ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪.৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। সংস্থাটি মনে করছে, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার এই প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে, সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়া এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং বলেন, 'বাংলাদেশ বর্তমানে একটি কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বহির্বাণিজ্য ও আর্থিক খাতের চাপ দ্বারা প্রভাবিত।' তিনি আরও যোগ করেন, 'নতুন সরকারের সংস্কার কর্মসূচি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য একটি সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করেছে। যথাযথ নীতি ও ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি আরও স্থিতিস্থাপক হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারবে।'
মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকের অবস্থা
প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি নিয়েও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯.০ শতাংশের কাছাকাছি উচ্চ অবস্থানে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার পেছনে উচ্চ বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য এবং চলমান সরবরাহ বিঘ্ন দায়ী। তবে আগামী অর্থবছরে এটি কিছুটা কমে ৮.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
অন্যান্য সূচকের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, চলতি হিসাবের ঘাটতি অর্থবছরে জিডিপির ০.৫ শতাংশ হবে, যা আগামী অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ০.৬ শতাংশ হতে পারে। এর প্রধান কারণ হবে আমদানি বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য ঘাটতির প্রসার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে বলে এডিবি আশাবাদী।
খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাব্য ঝুঁকি
এডিবির মতে, ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে মাঝারি প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে, যা শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, নির্বাচন-পরবর্তী সরকারি ব্যয় ও ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের উদ্যোগ দ্বারা ত্বরান্বিত হবে। সরবরাহ দিক থেকে, সেবা খাত পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা গৃহস্থালির ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব হবে।
- কৃষি খাত: অনুকূল আবহাওয়া ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।
- শিল্প খাত: রপ্তানি বৃদ্ধি, সরবরাহ বাধা কমে আসা এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে সরকারের জোর দেওয়ার ফলে শিল্প খাতেও প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
তবে এডিবি সতর্ক করে বলেছে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, শিপিং রুট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটলে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দেশে মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ জটিল হয়ে উঠতে পারে। সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেশি থাকলে, বিশেষ করে যদি জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি পায় অথবা মূল্য সমন্বয় যথাসময়ে করা না হয়, তাহলে সরকারের বাজেট ঘাটতিও বাড়তে পারে।



