বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের দাপট: যুদ্ধের জ্বালানি সংকটে নতুন সুযোগ
ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখন জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় দেশগুলো বিকল্প পথ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইভির দিকে ঝুঁকছে বিশেষভাবে। এই পরিস্থিতি চীনের কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, কারণ তারা ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক ইভি বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষার চাহিদা
জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশদূষণ রোধের কথা মাথায় রেখেই বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে এসেছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, এই খাতেও চীন এগিয়ে গেছে। চীনের বিওয়াইডি ইলন মাস্কের টেসলাকে ছাড়িয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ইভি কোম্পানি হয়ে উঠেছে। তাদের গাড়ির দাম তুলনামূলকভাবে কম, অন্তত টেসলার তুলনায়। যদি যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার যে আরও রমরমা হবে, তা বলাই বাহুল্য।
বিশ্ব ইভি বাজারে চীনের অগ্রগতি
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিওয়াইডি ২৫ লাখ ৬০ হাজার গাড়ি সরবরাহ করেছে। এই সংখ্যা জেলির প্রায় দ্বিগুণ এবং টেসলার তুলনায়ও অনেক বেশি। ফলে বিশ্ব ইভি বাজারে শীর্ষ অবস্থান এখন অনেকটাই এককভাবে ধরে রেখেছে তারা। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বৈশ্বিক ইভি বাজারের শীর্ষ অবস্থানে কত দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি সরবরাহে বিশ্বের শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকা দেখলে চীনের প্রভাব স্পষ্ট হয়:
- বিওয়াইডি
- জেলি
- টেসলা
- এসএইআইসি
- চাংআন
- চেরি
- ভক্সওয়াগন
- বিএমডব্লিউ
- স্টেলান্টিস
- অন্যান্য
এটি শুধু বিওয়াইডির সাফল্যের গল্প নয়, বরং চীনের সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতার প্রতিফলন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বড় পরিসরে উৎপাদনের সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয়—এ তিন কারণে চীনের কোম্পানিগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে বাড়ছে চীনা প্রভাব
চীনের এই অগ্রগতি এখন আর দেশীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নেই; লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে চীনা ইভির বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। তুলনামূলক কম দামে গাড়ি সরবরাহ করতে পারায় এসব বাজারে তারা সহজেই জায়গা করে নিচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতিতেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। আগে যেখানে চীনা ইভির ওপর শুল্ক বা নানা বিধিনিষেধ ছিল, এখন অনেক দেশ নিজেদের জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে সেই বাধা শিথিল করছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু দেশে সাশ্রয়ী ইভির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চীনা কোম্পানিগুলো নতুন সুযোগ পাচ্ছে।
চাপে পশ্চিমা নির্মাতারা
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেসলা এখনো শীর্ষস্থানীয় ইভি কোম্পানি হলেও বিক্রির দিক থেকে তারা তৃতীয় স্থানে। এ ঘটনায় বোঝা যায়, বাজার পরিস্থিতি কীভাবে বদলে যাচ্ছে। ভক্সওয়াগন, বিএমডব্লিউ ও স্টেলান্টিস শীর্ষ দশে থাকলেও তাদের সরবরাহ শীর্ষ চীনা ব্র্যান্ডগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশ্লেষকদের মতে, ইভি বাজার এখন আর শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতা নয়; বরং বড় পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এ লড়াইয়ে আপাতত এগিয়ে রয়েছে চীন। বিওয়াইডির গাড়িগুলো এক চার্জে ৪০০ থেকে ৫৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে, যা গ্রাহকদের জন্য আকর্ষণীয়।
জ্বালানিসংকটে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা
অস্ট্রেলিয়ায় ইভির প্রতি মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাংক এনএবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে ইভি কেনার জন্য ঋণের আবেদন ১০০ শতাংশ বেড়েছে। বিক্রয়কেন্দ্রগুলোয় ক্রেতাদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এনএবির তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও ইভি–সংক্রান্ত ঋণের খোঁজখবর নেওয়া বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বড় কোম্পানি—সবাই এখন পরিচালন ব্যয় কমানো এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশল হিসেবে ইভি ও বিদ্যুতায়নের দিকে ঝুঁকছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডেও বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। দেশটির পরিবহনমন্ত্রী ক্রিস বিশপ জানিয়েছেন, ২২ মার্চ শেষ হওয়া সপ্তাহে ১ হাজারের বেশি ইভি নিবন্ধন করা হয়েছে; আগের সপ্তাহের তুলনায় যা প্রায় দ্বিগুণ। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে পর সাপ্তাহিক নিবন্ধের দিক থেকে এটাই সর্বোচ্চ।
দক্ষিণ কোরিয়াতেও ইভি কেনার গতি বেড়েছে। মার্চ মাসে নিবন্ধন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। বাড়তি জ্বালানি মূল্য, টেসলা ও বিওয়াইডির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা এবং সরকারি ভর্তুকি নেওয়ার তাড়না—এ তিন কারণ এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুযোগ
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ইভির বাড়তি চাহিদা চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে। দেশীয় বাজারে বিক্রির গতি কিছুটা কমে আসায় তারা এখন রপ্তানির দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। চায়না প্যাসেঞ্জার কার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, চীনে এখন যত গাড়ি বিক্রি হয়, তার মধ্যে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি অর্ধেকের বেশি। এই শক্তিশালী ভিত কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক বাজারে আরও বিস্তার ঘটাতে চাচ্ছে চীনের কোম্পানিগুলো।
সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি সংকট এবং পরিবেশগত চাপ বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারকে গতিশীল করছে, যেখানে চীন তার উৎপাদন সক্ষমতা ও সাশ্রয়ী মূল্যের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও জোরালো হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



