মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব: বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, যা আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে এখন বিকল্প উৎস থেকে উচ্চ দামে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি নিয়ে অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র হবে।
সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতে অফিস ও ব্যাংক লেনদেনের সময় কমানো, দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বন্ধ রাখা এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয় ৩০ শতাংশ হ্রাস করার মতো সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের দুর্বলতা এখন পর্যন্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করে, বোরো ধান উৎপাদনে সেচসহ কৃষিযন্ত্র সচল রাখতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ার সংবাদ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কৃষি খাতে ডিজেল সংকট: খাদ্যনিরাপত্তার জন্য হুমকি
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না, অথবা বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। চট্টগ্রাম, জামালপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ ১২টি জেলার ১৫ জন কৃষক এই সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও ডিজেল পেতে কৃষকদের ভোগান্তির চিত্র ফুটে উঠেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করছে যে তারা কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শস্য হলো বোরো ধান, যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত বোরো মৌসুমে বৃষ্টিপাতের অভাবে প্রায় পুরোটাই সেচনির্ভর হয়ে পড়ে, যেখানে বেশির ভাগ সেচপাম্প ডিজেল দ্বারা চালিত হয়। বর্তমানে বেশির ভাগ জায়গায় বোরোর ধানে শিষ আসছে, এবং এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহ না পেলে সেচসংকটে ধানের শিষ নষ্ট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান উদ্বেগ
২০০৭-০৮ এবং ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, বোরো ধান উৎপাদন কম হলে খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলে ফসলহানির কারণে বোরো উৎপাদন কম হওয়ায় চালের দাম লাফিয়ে বেড়েছিল। তাই, সরকারের উচিত অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বোরো ধানের সেচ যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি মনে রাখা জরুরি যে জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে যে সংকট সৃষ্টি হতে পারে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। দেশে শস্য কাটা ও মাড়াইয়ে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, বর্তমানে মোট ফসলের ১৫ শতাংশ যন্ত্র দিয়ে কাটা হয়। ডিজেল সংকটের কারণে ধান কাটা নিয়ে কৃষকদের মধ্যেও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
সমাধানের পথ: অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অভাবনীয় পরিস্থিতি মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা হাতে নেওয়া। এ মুহূর্তে কৃষি, শিল্প ও পণ্য পরিবহন খাতকে অবশ্যই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান যথার্থই বলেছেন যে জ্বালানিসংকটে কৃষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
এই সংকটকালে সরকারের উচিত বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি করে এবং প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা।只有这样, বাংলাদেশ তার খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা করতে পারবে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।



