ট্রাম্পের হুমকিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছাড়ালো
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১.৬% বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০.৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দামও ০.৮% বেড়ে ১১২.৪০ ডলারে পৌঁছেছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও হরমুজ প্রণালি সংকট
রোববার (৫ এপ্রিল) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'মঙ্গলবারের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি না দিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলা চালাবে।' এই হুমকির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের প্রতিশোধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে হুমকি দিচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে চাওয়া যেকোনো জাহাজের ওপর তারা আক্রমণ চালাবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও গ্যাস পরিবহন ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে রোববার উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের তেল স্থাপনায় ইরানের হামলা অব্যাহত ছিল। তেহরান স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছে যে তারা কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় একাধিক হামলা চালিয়েছে।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সতর্কতা
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সোমবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে, যদি তাদের দেশের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলা আরও বাড়ানো হবে। এই সতর্কতা আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
ওপেকপ্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাস্তবতা
সৌদি আরব ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন বড় তেল উৎপাদক দেশগুলোর জোট ওপেকপ্লাস রোববার মে মাসের উৎপাদন সামান্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে।
তবে বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর নাও হতে পারে। সংঘাতের কারণে জোটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারছে না, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহে আরও চাপ সৃষ্টি করছে।
ট্রাম্পের পূর্ববর্তী হুমকি ও প্রভাব
ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি বাড়ানোর পরই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে যায়। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিলেন যে আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা ইরানকে 'প্রস্তর যুগে' ফিরিয়ে নেবে। এই ধরনের যুদ্ধংদেহী বক্তব্য বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্থির করে তুলছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিশ্ববাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। ট্রাম্পের হুমকি এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে, যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।



