মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে সংকটের ছায়া
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যে নানামুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে সামনের দিনগুলোতে আরও বড় আকারের অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে দেশ।
জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও পরিবহন বিলম্ব
শিপিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, সমুদ্রগামী মাদার ভেসেলের ভাড়া প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিঙ্গাপুর, সাংহাই এবং লস অ্যাঞ্জেলসগামী ফিডার জাহাজের কনটেইনার ভাড়া বক্সপ্রতি সর্বনিম্ন ৭০০ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ৯৫০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যগামী রুটে ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি হলেও সময়মতো পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া, বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি নির্ধারিত ভাড়ার পাশাপাশি ‘ইমারজেন্সি বাংকার সারচার্জ’ নামে অতিরিক্ত ফি আরোপ করেছে, যা আমদানি-রপ্তানি খাতের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানিসংকট ও লাইটার জাহাজ পরিচালনায় সমস্যা
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে গভীর ড্রাফটের মাদার ভেসেল নোঙর করার পর সেখান থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করা হয়। তবে, জেটিতে জায়গার অভাব কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় এসব জাহাজকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে লাইটার জাহাজ পরিচালনায় জ্বালানিসংকটকে কেন্দ্র করে।
প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা থাকলেও মাত্র ৬০ হাজার লিটার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে, যা মোট চাহিদার এক-চতুর্থাংশেরও কম। এই সংকটের ফলে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে অন্তত পাঁচ দিন বিলম্ব হচ্ছে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
ডেমারেজ খরচ ও ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব
এই বিলম্বের কারণে প্রতিদিন প্রতি মাদার ভেসেলকে প্রায় ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ বা ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে। যদিও এই অতিরিক্ত ব্যয় বর্তমানে ব্যবসায়ীরাই বহন করছেন, তবে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব সরাসরি পড়বে ভোক্তা পর্যায়ে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।
এ পরিস্থিতিতে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতেই ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে বিশ্ব বাণিজ্য যেমন চাপের মুখে পড়েছিল, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবও তেমনই নতুন সংকট তৈরি করছে।
জাহাজ মালিকদের বক্তব্য ও সম্ভাব্য সমাধান
অন্যদিকে, জাহাজ মালিকরা দাবি করছেন যে তারা সরাসরি ভাড়া বাড়াননি। তবে ডিজেলসংকটের কারণে পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ সরবরাহ সম্ভব না হওয়ায় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে এবং তাতেই ডেমারেজ খরচ বাড়ছে। শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাড়তি ভাড়া এবং দীর্ঘ সময় জাহাজ অলস দাঁড়িয়ে থাকার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করবে।
এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত পর্যাপ্ত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের গতি বাড়ানোর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তারা সতর্ক করে বলছেন, অন্যথায় দেশের বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ সংকটও তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ।



