হরমুজ প্রণালি বন্ধে ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি কাগুজে, যুদ্ধে জ্বালানি সংকট তীব্র
হরমুজ বন্ধে ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি কাগুজে

হরমুজ প্রণালি বন্ধে ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধি কাগুজে, যুদ্ধে জ্বালানি সংকট তীব্র

ইরানে চলমান যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ওপেক প্লাস সংগঠনের সদস্য দেশগুলো রবিবার এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মে মাসের জন্য তেল উৎপাদন কোটা দৈনিক দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞরা এই বৃদ্ধিকে ‘তাত্ত্বিক’ বা কাগুজে বলে আখ্যা দিয়েছেন, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাস্তবে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের রুট হিসেবে পরিচিত। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই জলপথ বন্ধ থাকায় গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে ওপেক প্লাসের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের জ্বালানি রফতানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ১২০ ডলারে পৌঁছে গেছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই দাম বৃদ্ধি পরিবহন জ্বালানির মূল্যেও প্রভাব ফেলেছে, বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ওপেক প্লাসের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা

ওপেক প্লাসের সদস্যরা দৈনিক দুই লাখ ছয় হাজার ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিলেও, এটি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে ব্যাহত সরবরাহের মাত্র দুই শতাংশেরও কম প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনের সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, জলপথটি পুনরায় চালু হলে উৎপাদন বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি এসপেক্টস এই বৃদ্ধিকে অর্থহীন বলে উল্লেখ করেছে, যতক্ষণ না প্রণালিতে সমস্যা সমাধান হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্লেষকদের মতামত

ওপেকের সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে রায়স্টার্ড এনার্জিতে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান জোর্জে লিয়ন বলেন, “বাস্তবে এটি বাজারে খুব অল্প পরিমাণ তেলই যোগ করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানোর কোনও মানে নেই।” তার মতে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অবকাঠামোগত ক্ষতি ও হামলার ঝুঁকি উৎপাদন বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

হামলা ও নিরাপত্তা উদ্বেগ

ওপেক প্লাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যা মেরামত করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, যুদ্ধ থেমে গেলেও এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা হলেও জ্বালানি উৎপাদনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে কয়েক মাস লাগবে।

অন্যান্য দেশের অবস্থা

উপসাগরীয় দেশগুলো ছাড়াও রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশও উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে তারা চাইলেও তেল উৎপাদন বাড়াতে অক্ষম। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালিতে আংশিক চলাচল

এদিকে, ইরাকে তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়াতে সায় দিয়েছে ইরান। রবিবারের শিপিং ডেটা দেখিয়েছে যে, ইরাকের কাঁচা তেল ভর্তি একটি ট্যাঙ্কার প্রণালি দিয়ে যাচ্ছে। তবে, বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়, কারণ ভবিষ্যতে আরও জাহাজ এই ঝুঁকি নেওয়ার জন্য এগুবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আংশিক চলাচল সামগ্রিক সরবরাহ সংকট সমাধানে যথেষ্ট নয়।

সর্বোপরি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ওপেক প্লাসের উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, এবং সরকারগুলোকে সরবরাহ ঠিক রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা ও দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।