যুদ্ধের মধ্যেও ইরানি তেল কিনছে ভারত, মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল কিনতে শুরু করেছে ভারতের পরিশোধনাগারগুলো। গতকাল শনিবার দেশটির তেল মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, সাত বছর পর আবারও ইরানের তেল আমদানি করা হচ্ছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা ভারত ২০১৯ সালের মে মাসের পর তেহরান থেকে তেল কেনেনি, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে তখন ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করা হয়েছিল।
বিকল্প উৎস খুঁজতে ইরানের দিকে ঝুঁকেছে ভারত
মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিকল্প উৎস খুঁজতে গিয়ে ইরানের দিকে ঝুঁকেছে ভারত। বিভিন্ন উৎস থেকে তেল কিনে সরবরাহ সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে দেশটি, যার অংশ হিসেবে ইরানি তেল আমদানি পুনরায় শুরু হয়েছে। এর আগে মার্চ মাসে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা ৯০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
ভারতের তেল মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ ব্যাহত হলেও ভারতের পরিশোধনাগারগুলো অপরিশোধিত তেলের জোগান নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে ইরান থেকেও তেল কেনা হচ্ছে এবং ইরানের তেল আমদানিতে অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা যে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভুল বলে দাবি করেছে মন্ত্রণালয়।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জাহাজের গন্তব্য পরিবর্তন
সরবরাহ সংকট সামাল দিতে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইরানের তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও ইরানের তেল প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এদিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি জাহাজে করে ইরান থেকে ৪৪ হাজার মেট্রিক টন তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) কিনেছে ভারত, যা বুধবার ভারতের পশ্চিম উপকূলের ম্যাঙ্গালুরু বন্দরে নোঙর করেছে।
জাহাজের গন্তব্য পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে জাহাজের গন্তব্য বদলানো অস্বাভাবিক নয়। বিল অব লেডিংয়ে সাধারণত সম্ভাব্য খালাস বন্দরের নাম উল্লেখ থাকে এবং পরিচালনাগত ও বাণিজ্যিক কারণে সমুদ্রপথেই কার্গোর গন্তব্য পরিবর্তন করা হতে পারে। মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়ার দাবি তেল বাণিজ্যের বাস্তব কার্যপ্রণালির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আগামী কয়েক মাসের জন্য ভারতের অপরিশোধিত তেলের চাহিদা অনুযায়ী জোগান নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরানের তেল বিক্রি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রভাব
এদিকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই যুদ্ধের মধ্যেও দেশটির তেল বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের জ্বালানি বাণিজ্য অনেকটা কমে গেলেও ইরানের বেলায় ঠিক উল্টোটা ঘটছে, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। ট্যাংকারট্র্যাকারস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে ইরান প্রতিদিন গড়ে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলারের তেল বিক্রি করছে, ফেব্রুয়ারি মাসে যা ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে ইরানি তেলের দামের ব্যবধান এখন মাত্র ২ ডলার ১০ সেন্ট, যুদ্ধের আগে এই ব্যবধান ছিল ১০ ডলারের বেশি। এই বাড়তি আয়ের কারণে ইরানের যুদ্ধ বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম মজুত—উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা হচ্ছে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
ভারতের তেল মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বর্তমানে দেশটি ৪০টির বেশি দেশ থেকে তেল আমদানি করে এবং বাণিজ্যিক বিবেচনায় বিভিন্ন উৎস ও অঞ্চল থেকে তেল সংগ্রহে কোম্পানিগুলোর পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়ার আরেক খবরে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে ভারতের তেল আমদানি আগের মাসের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে, যা চলমান জ্বালানি চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে।



