হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ, বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন (ইউএনসিটিএডি) এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
জাহাজ চলাচলে ৯৫% হ্রাস
ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করতো। তবে মার্চ মাসে সেই সংখ্যা হ্রাস পেয়ে মাত্র ছয়টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯৫ শতাংশ কমে গেছে। এই নাটকীয় পতন বিশ্বের অধিকাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে, যা সরাসরি উৎপাদন, বাণিজ্য ও ভোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যদি এই 'প্রতিবন্ধকতা' অব্যাহত থাকে বা আরো বৃদ্ধি পায় এবং জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য চড়া থাকবে। এর ফলে বিশ্ব জুড়ে স্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের মতো অঞ্চলগুলো, যারা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অধিক নির্ভরশীল, তারা বর্তমানে আরো বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
চীনের সতর্কতা: যুদ্ধ চললে স্থিতিশীলতা নেই
এদিকে, ইরানের সঙ্গে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলমান থাকলে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ 'হরমুজ প্রণালি' কখনোই স্থিতিশীল হবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছে চীন। বৃহস্পতিবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই সতর্কবার্তা দেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়। তিনি সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে এক ফোনালাপে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান।
ওয়াং ই বলেন, "হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের বিষয়টি ইরান যুদ্ধেরই একটি পরোক্ষ প্রভাব এবং যতদিন এই যুদ্ধ চলবে, ততদিন এই জলপথ স্থিতিশীল থাকবে না।" এর আগে, গত মঙ্গলবার বেইজিংয়ে পাকিস্তান ও চীনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ-চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
ইরান যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহ ও হরমুজ নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহ চলছে; যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী। পরে 'অপারেশন এপিক ফিউরি' নামে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রও। এর জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ইসরাইল ও মার্কিন স্বার্থ লক্ষ্য করে পালটা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
সাবেক সিআইএ প্রধানের সতর্কতা
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সতর্ক করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক বিল বার্নস। ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের এক পডকাস্টে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব ইউরোপীয় মিত্র বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নিতে পারে।
বার্নসের মতে, "এবার নীতিটি হতে পারে এমন, 'আমরা ভেঙেছি, এখন দায়ভার তোমাদের'।" তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যুদ্ধকে 'পছন্দমাফিক যুদ্ধ' বলে অভিহিত করেন এবং সতর্ক করেন যে এই যুদ্ধ ইরানের কট্টরপন্থিদের আরো শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
ওবামা শাসনামলে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির আগে তেহরানের সঙ্গে গোপন আলোচনায় অংশ নেওয়া এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক আরো বলেন, ইরান সরকার অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার মতো অনেক বিষয়ে অদক্ষ হতে পারে, কিন্তু তারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন চালাতে পারদর্শী। এমনকি শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলেও তারা টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের নিহতের ঘটনায় দেশটিতে 'শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন' হয়েছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে একমত নন বিল বার্নস। তিনি বলেন, কিছু দিক থেকে এই শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখন আরো বেশি উগ্র, কট্টর ও রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে। ইরানি নেতাদের কাছে টিকে থাকাই হলো বিজয়।
বার্নস আরো বলেন, "আমি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বাস করি যে এই শাসনব্যবস্থা পতনের দিকেই যাচ্ছে। কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা সেই পতনের মুহূর্তকে ত্বরান্বিত করার বদলে উলটো কিছুটা ধীর করে দিয়েছি।"
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার সমাধান খুঁজতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



