ট্রাম্পের ভাষণে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা
ইরান যুদ্ধের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণ বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে নতুন করে অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার রাত ৯টায় (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায়) দেওয়া এই ভাষণের পরপরই ক্রুড অয়েলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে এবং এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরান সংকটের সমাধানের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব
জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) ৩ মার্চ এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং হুমকি দেয় যে, কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রণালি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যার এক পাশে ইরান ও অন্য পাশে ওমান অবস্থিত।
বিশ্বের মোট তেল, কনডেনসেট ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ৩০ শতাংশের বেশি এই পথ দিয়ে পরিবহণ করা হয়। ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতার থেকে অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো এই সরু পথ দিয়েই চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করে এবং ব্যস্ত সময়ে প্রতি ছয় মিনিট পরপর জাহাজ চলতে দেখা যায়।
তেলের দামে উল্লম্ফন
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইতিমধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছিল। গতকাল বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্পের ভাষণের পর এখন তা ৫ শতাংশ লাফ দিয়ে বেড়ে ১০৬.২৯ ডলারে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৪ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ১০৪.২৯ ডলারে উঠেছে। ইন্টারক্যাপিটাল এনার্জির বিশেষজ্ঞ আলবার্তো বেলোরিনের মতে, ট্রাম্পের ভাষণে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না করায় বাজারের আশাবাদ দ্রুত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
বেলোরিন আরও যোগ করেন, "স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা এখন সপ্তাহের পরিবর্তে কয়েক মাস দূরে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের ভাষণে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আগের আশাবাদের পর এই দাম বৃদ্ধি বাজারের জন্য একটি স্পষ্ট বাস্তবতার প্রতিফলন।"
শেয়ারবাজারে ধস
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণের পর এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারে তীব্র ধস নেমেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পতন হয়েছে এবং হংকংয়ের হ্যাং সেন সূচক ১ শতাংশ নিম্নমুখী ছিল। ফেব্রুয়ারির শেষে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলো ক্রমাগত অস্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে, মার্কিন স্টক ফিউচারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে, যা বৃহস্পতিবার সকালে ওয়াল স্ট্রিটের নিম্নমুখী সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডাও জোন্স এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার প্রায় ১ শতাংশ কমে গেছে, অন্যদিকে নাসডাক ফিউচার প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের মূল বিষয়
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো তেল আমেরিকায় আসে না এবং আমেরিকা এই রুটের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি বলেন, "আমাদের ওখানকার তেলের দরকারও নেই।" এরপর তিনি হরমুজ প্রণালির ওপর যেসব দেশ নির্ভরশীল তাদের এগিয়ে আসতে বলেন এবং প্রয়োজনে তাদের সাহায্যের আশ্বাস দেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্যে ইরান সংকটে আমেরিকার সরাসরি সম্পৃক্ততা কম থাকলেও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ব্যাপক। তেল যেহেতু বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাই হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দামের এই উল্লম্ফন বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো, যেখানে এই প্রণালি দিয়ে পরিবহণ করা তেলের প্রায় ৮২ শতাংশ যায়, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।



