মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ছায়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের তীব্রতা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে প্রবল চাপের মুখে ফেলেছে। গত বছরের সংক্ষিপ্ত সংঘাতের বিপরীতে এবারের যুদ্ধ এক মাস পেরিয়ে গেছে, যেখানে উভয় পক্ষ আধুনিক মিসাইল, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রভাব সরাসরি আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে, যেখানে জ্বালানি পাম্পগুলিতে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
কৃষি ও মৎস্যচাষে ডিজেল সংকটের মারাত্মক প্রভাব
বোরো ধানের সেচ কাজে কৃষকরা পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না, আর প্রাপ্যতাও উচ্চমূল্যে। অন্যদিকে, সমুদ্র ও মোহনায় মাছ ধরার নৌকাগুলো ডিজেলের অভাবে তীরে অলসভাবে পড়ে আছে, যা মৎস্য খাতকে ব্যাহত করছে। সরকার দাবি করছে জ্বালানি তেলের মজুত ও সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই, কিন্তু বাস্তবে প্যানিক বায়িং, মজুতদারি ও তেল পাচারের কারণে সংকট প্রকট হচ্ছে। গোয়ালঘর, বাগান থেকে মজুতকৃত তেল উদ্ধারের খবর সংকটের গভীরতা নির্দেশ করে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের পদক্ষেপ ও সীমাবদ্ধতা
যুদ্ধ শুরুর পর সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের নীতি ঘোষণা করে, প্রথমে রেশনিং চালু করলেও ঈদের আগে তা প্রত্যাহার করে। ইরান বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, যা একটি স্বস্তির খবর। এছাড়া রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এপ্রিল মাসে দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা জনজীবনে কিছু স্বস্তি দিতে পারে।
শিক্ষা খাতে অনলাইন ক্লাস উদ্যোগ: নতুন উদ্বেগের কারণ
জ্বালানি সংকটের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন সশরীর ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে করোনা মহামারিকালের তিক্ত অভিজ্ঞতা অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তখন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপক শিখনঘাটতি ও ডিজিটাল বিভাজন তৈরি করেছিল, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য। একজন চিকিৎসক অভিভাবক তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, অনলাইন ক্লাস শিশুদের মুঠোফোন আসক্তি বাড়াতে পারে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা আরেকটি বড় সমস্যা।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি
গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়া, এসির অত্যধিক ব্যবহার ও ব্যক্তিগত গাড়ির বৃদ্ধি জ্বালানি সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। সরকারের উচিত অফিস ও স্কুলের সময় এগিয়ে আনা, মার্কেট বন্ধ রাখা ও জোড়-বিজোড় নম্বর প্লেটের গাড়ি নিয়ন্ত্রণের মতো বিকল্প পদক্ষেপ বিবেচনা করা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, তাই একটি আপৎকালীন জ্বালানি কৌশলপত্র প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নীতির ঘাটতি ও সমন্বয়হীনতা দূর করে টেকসই সমাধানের দিকে এগোতে হবে, যাতে জনজীবন ও অর্থনীতি রক্ষা পায়।



