ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইউএই অর্থনীতিতে ধাক্কা

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের জেরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। দেশটির অর্থনীতির প্রধান খাত বিমান পরিবহন, পর্যটন ও আবাসন একযোগে বড় ধাক্কা খাচ্ছে, ফলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বহুমুখী অর্থনৈতিক মডেলের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শেয়ারবাজারে তীব্র পতন

গত এক মাসে দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য ১২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুবাইয়ের শেয়ারবাজার সূচক ১৬ শতাংশ কমে গেছে, যা আবুধাবির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি পতন। একই সময়ে বাতিল হয়েছে ১৮ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট, যা বিমান খাতের স্থবিরতা নির্দেশ করে।

আবাসন খাতে সংকোচন

দুবাইয়ের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি আবাসন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে যেখানে লেনদেন ১৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল, সেখানে এখন বাজার দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। মার্চ শেষে রিয়েল এস্টেট সূচক কমেছে অন্তত ১৬ শতাংশ। গোল্ডম্যান স্যাকসের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে আবাসন লেনদেন কমেছে ৩৭ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় বিক্রি অর্ধেকেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। দ্রুত বিক্রির জন্য অনেক সম্পত্তি ১০–১৫ শতাংশ কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বুর্জ খলিফার নির্মাতা এমার প্রপার্টিজের শেয়ারমূল্য ২৫ শতাংশের বেশি কমেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পর্যটন খাতে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসপণ্যের বাজারে ইউএই, বিশেষ করে দুবাই, দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০২৫ সালে শহরটিতে ২ কোটির বেশি বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন। তবে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই প্রবাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। দুবাই ও আবুধাবি এতদিন অস্থির অঞ্চলের মধ্যেও নিজেদের ‘নিরাপদ গন্তব্য’ হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু এখন সেই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। ইউরোপীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীলতা (মোট পর্যটকের ২০ শতাংশের বেশি) পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এ ছাড়া বিদেশি নাগরিকদের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। হামলার ভিডিও ধারণ ও শেয়ার করার অভিযোগে কয়েকজন বিদেশিকে আটক করার ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিমান খাত প্রায় স্থবির

ইউএইর আরেকটি প্রধান খাত বিমান পরিবহনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা বছরে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ যাত্রী পরিবহন করে, হামলার কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এক দিনেই দুবাই, আবুধাবি, শারজা ও আল মাকতুম বিমানবন্দরের ৩ হাজার ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারলাইনস সাময়িকভাবে কার্যক্রম স্থগিত করেছে, ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হোটেল খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। কক্ষ বুকিং কমে যাওয়ায় হোটেলগুলো ভাড়া কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক ধনী প্রবাসী দেশ ছাড়তে ব্যক্তিগত বিমানে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ

ইরানের হামলায় আবুধাবি ও দুবাইয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে পর্যটন ও জ্বালানি অবকাঠামোও রয়েছে। এতে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বেড়েছে। সিটি ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যেখানে আগে তা ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইউএইর অর্থনীতি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। বহুমুখী খাতে নির্ভরশীল এই অর্থনৈতিক কাঠামো এখন বড় পরীক্ষার মুখে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ বিভিন্ন প্রচারণামূলক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে—আঞ্চলিক অস্থিরতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়, এমনকি শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি হলেও।