যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নতুন প্রশ্ন, বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: নতুন প্রশ্ন, বিশ্লেষকদের উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর নতুন করে আলোচনায়

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করার পর এই চুক্তির ভবিষ্যৎ, কার্যকারিতা এবং বাংলাদেশের জন্য এর প্রকৃত অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আদালতের রায়ের পর চুক্তির ভিত্তি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে।

অসম চুক্তি ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী হওয়ার অভিযোগ

অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং বামপন্থি রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশ চুক্তিটিকে 'অসম' এবং 'জাতীয় স্বার্থবিরোধী' আখ্যা দিয়ে তা পুনর্বিবেচনা কিংবা বাতিলের দাবি তুলেছেন। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এ চুক্তির ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ বা তাদের বিনিয়োগ আকর্ষণে ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের শর্ত আরোপের কথাও বলা হয়েছে।

চুক্তির বাস্তবায়ন ও রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি এখনও কার্যকর হয়নি। এটি কার্যকর করতে হলে দুই দেশের সংসদে অনুমোদন প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, চুক্তিটি দেশের জন্য যতটা সুবিধা বয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে ততটা নয়; বরং এতে ক্ষতির ঝুঁকিই বেশি। বিশেষ করে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিতে হবে
  • যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে পাল্টা শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে
  • বাস্তব বাণিজ্যের চিত্রে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি শত কোটি টাকা
  • যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ছাড় কয়েক কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ

পাল্টা শুল্ক থেকে চুক্তি: বিতর্কের সূচনা

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার যুক্তিতে কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে শুল্কচাপ কমানো এবং বাণিজ্য সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে দুই দেশের মধ্যে 'রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (আরটিএ)' নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের সময় নিয়েও প্রশ্ন

সমালোচনার আরেকটি বড় কারণ হলো চুক্তি স্বাক্ষরের সময়কাল। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এই চুক্তি সই করা হয়। সমালোচকদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চুক্তি নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়া উচিত ছিল।

বাণিজ্যের বাইরে কৌশলগত শর্ত

এই চুক্তি কেবল শুল্ক ছাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে জ্বালানি, কৃষি, প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তি খাতেও কিছু প্রতিশ্রুতি যুক্ত হয়েছে:

  1. বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি কেনার পরিকল্পনা গ্রহণ করবে
  2. কৃষিখাতে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি রয়েছে
  3. বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে
  4. বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে

নীতিগত স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "বাণিজ্য চুক্তির নামে বাংলাদেশকে কার্যত আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হয়েছে।" সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, "অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি চরমভাবে বৈষম্যমূলক এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি।"

রাজনৈতিক সমালোচনা ও বাতিলের দাবি

বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো চুক্তি বাতিলের দাবিতে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা 'দাসত্বের চুক্তি' বাতিল করতে হবে।" গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট চুক্তিটিকে "অসম ও দেশবিরোধী" আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

চুক্তির ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য পদক্ষেপ

চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের রায়ের পর পরিস্থিতি এখনও পরিষ্কার নয় এবং চুক্তিটি বাতিলও হয়ে যেতে পারে। সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন দাবি করেছেন, চুক্তিতে 'এন্ট্রি' ও 'এক্সিট'— দুটি ধারা রয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের উচিত পুরো চুক্তিটি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজনে সংশোধন বা নতুন আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ নিশ্চিত করা।