ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনায় তেলের দাম ১১৬ ডলার ছাড়াল, এশিয়ার শেয়ার বাজারে বড় ধস
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত ১৯ মার্চের পর সর্বোচ্চ মূল্য। এই দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার প্রধান শেয়ার বাজারগুলোতে, যেখানে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
হরমুজ প্রণালি অচল থাকায় তেল সরবরাহ ব্যাহত
দশকের ভয়াবহতম এই জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হওয়া। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় এই সমুদ্রপথ দিয়ে। বর্তমানে এই পথটি কার্যত অচল থাকায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন, নৌ-চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে চরম উত্তেজনা
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তারা যে কোনো মার্কিন স্থল হামলা মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তেহরান অভিযোগ করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আগ্রাসনের পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, গত সপ্তাহান্তে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা প্রথমবারের মতো ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং লেবাননে ইসরাইলি অভিযান সম্প্রসারিত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছেন যে আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে ইরান যদি সমুদ্রপথের ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ না সরায়, তবে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। যদিও ট্রাম্প পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি শান্তি চুক্তির সম্ভাবনার কথা বলেছেন, তবে ইরান সেই প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান শর্ত দিয়েছে যে যুদ্ধবিরতির জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে হবে এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা: দাম ১২০ ডলার ছাড়াতে পারে
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলের এই ঘাটতির প্রকৃত প্রভাব কেবল অনুভূত হতে শুরু করেছে। ওনিক্স ক্যাপিটাল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ নিউম্যানের মতে, ইউরোপ এবং অন্যান্য অঞ্চলে তেলের প্রকৃত সংকট আরও প্রকট হবে এবং দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি উল্লেখ করেছেন, যদিও পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি দেশের পতাকাবাহী জাহাজকে ইরান যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছে, তবে তা যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দৈনিক ১২০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ যাতায়াত করছে।
দেশগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নিচ্ছে
এই সংকটের প্রভাবে অনেক দেশ ইতোমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোতে ধস এই অর্থনৈতিক চাপেরই প্রতিফলন বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তরফ থেকে জরুরি আলোচনা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানানো হচ্ছে, যাতে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল সরবরাহ পুনরায় চালু করা যায় এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট প্রশমিত হয়।



