হরমুজ প্রণালি বন্ধ: ইরানের টোল আদায়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক মন্দার ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব ও বর্তমান অবস্থা
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে স্বীকৃত। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তেহরান এটিকে কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ২ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়েছে। এই সংকীর্ণ নৌপথটির উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান। বৃহস্পতিবার ইরানি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহন পথ দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর কাছ থেকে টোল আদায়ের জন্য আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট।
ইরানের টোল আদায়ের প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে ইরানের কাছে দেনদরবার করছে। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশ থেকে তেল ও গ্যাস রপ্তানির জন্য এটাই একমাত্র সমুদ্রপথ। যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে ইরান পাঁচটি দাবির একটি হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়েছে।
ইরানি পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা তাসনিম ও ফারসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগিরই ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির আইনি দল এটি চূড়ান্ত করবে। এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, 'এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানকে ফি আদায় করতে হবে।'
ওই কর্মকর্তা আরও বলেছেন, 'এটি একেবারেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অন্যান্য করিডরগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো দেশের মধ্য দিয়ে পণ্য পরিবহন করলে শুল্ক দিতে হয়। হরমুজ প্রণালিও একটি করিডর। আমরা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। তাই জাহাজ ও ট্যাঙ্কারগুলো আমাদের শুল্ক দেবে—এটাই যৌক্তিক।'
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ভূমিকা
অভ্যন্তরীণ এ আইনি কাঠামোটি এখনো চূড়ান্ত না হলেও, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি 'টোল বুথ' ব্যবস্থা চালু করেছে। গত বুধবার জাহাজ চলাচল বিষয়ক সাময়িকী লয়েডস লিস্ট এমন খবর প্রকাশ করেছে।
নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় হরমুজ প্রণালি পার হতে জাহাজগুলোকে আইআরজিসির সঙ্গে সম্পৃক্ত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এবং জাহাজের সমস্ত তথ্য জমা দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—নথিপত্র, আইএমওর নম্বর, পরিবহনকৃত পণ্য, ক্রু সদস্যদের নাম এবং জাহাজের চূড়ান্ত গন্তব্য।
মধ্যস্থতাকারীরা এসব তথ্য আইআরজিসির নৌ কমান্ডে জমা দেন। এই কমান্ড তথ্যগুলোর সত্যতা যাচাই করে। যদি কোনো জাহাজ যাচাইবাছাই প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়, তাহলে আইআরজিসি সেটিকে একটি ক্লিয়ারেন্স কোড দেয় এবং প্রণালি পারাপারের জন্য নির্ধারিত রুট সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়।
টোল আদায়ের বৈধতা ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিভঙ্গি
জাতিসংঘের সমুদ্র আইনসংক্রান্ত সনদ (ইউএনসিএলওএস)-এর ধারা ৩৮ অনুযায়ী, সব জাহাজ ও উড়োজাহাজ 'ট্রানজিট প্যাসেজের অধিকার' ভোগ করে, যা কোনো দেশ স্থগিত করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্র আইনসংক্রান্ত সনদের ধারা ১৭ অনুযায়ী, প্রত্যেকটি বিদেশি জাহাজের কোনো দেশের জলসীমা দিয়ে নির্বিঘ্নে পারাপারের অধিকার রয়েছে।
ভারতের আইনি পরামর্শক সংস্থা এএনবি লিগ্যালের অংশীদার অপূর্ব মেহতা আল–জাজিরাকে বলেন, 'ইরান ইউএনসিএলওএস-এর স্বাক্ষরকারী হলেও দেশটির পার্লামেন্টে এটি অনুমোদন করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে ইরান যুক্তি দেখাতে পারে যে তারা এই আন্তর্জাতিক বিধির আওতায় বাধ্য নয়।'
সামুদ্রিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং লন্ডনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাসন চুয়াহ বলেন, হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানটি ২১ নটিক্যাল মাইল (৩৯ কিমি) প্রশস্ত। আর ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, দেশগুলো তাদের উপকূল থেকে সর্বাধিক ১২ নটিক্যাল মাইল (২২ কিমি) পর্যন্ত জলসীমা দাবি করতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইরানের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি বিতরণ সীমিত করতে ও শিল্প উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত আলোচনার পর মালয়েশিয়া, চীন, মিসর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি পারাপারের অনুমতি পেয়েছে। ইরানের ভাষায় এসব দেশ তাদের বন্ধু দেশ। লয়েডস লিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রণালি পার হতে কমপক্ষে দুটি জাহাজ চীনের মুদ্রা ইউয়ানে ফি দিয়েছে।
এই সংকটের সমাধান না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক মন্দার সৃষ্টি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে আরও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।



