মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা: বাংলাদেশের বাজার, শিল্প ও খাদ্যনিরাপত্তায় চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা বাংলাদেশে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক ধাক্কা: বাংলাদেশের বাজার, শিল্প ও খাদ্যনিরাপত্তায় চাপ

গোলাম রসুলের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ হাজার মাইল দূরে হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বাজার, শিল্প ও বাড়ির রান্নাঘরে পৌঁছে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটতেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

জ্বালানি ধাক্কা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাব

আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়; এটি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল্য–কাঠামো নির্ধারণের একটি মৌলিক উপাদান। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রতি এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৫ শতাংশ আসে আমদানি করা জ্বালানি—তেল, কয়লা ও এলএনজি থেকে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুতই দেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে পেট্রোলিয়াম আমদানির ব্যয় ছিল প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি কঠিন নীতি দ্বিধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে, নাকি ভর্তুকি বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতির চাপ বাড়ানো হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্ধারণ করছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে এবং শিল্পোৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে।

শিল্প, বাণিজ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর প্রভাব

জ্বালানিসংকটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষি খাতে। বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি তৈরি পোশাকশিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ সরবরাহ করে; কিন্তু গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্পোৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়িয়ে দেয়—বিদ্যুৎ, পরিবহন, কাঁচামাল আমদানি ও সরবরাহ শৃঙ্খল—সব ক্ষেত্রেই চাপ সৃষ্টি করে।

বর্তমান বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থায় শিল্পগুলো একটি জটিল সরবরাহ–শৃঙ্খলের অংশ। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু কারখানার বিদ্যুৎ ব্যয়ই বাড়ায় না; এটি আন্তর্জাতিক শিপিং, লজিস্টিক ও কাঁচামাল পরিবহনের খরচও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

কৃষি খাতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশই ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ডিজেলের গড় আন্তর্জাতিক মূল্য চলতি মার্চে প্রতি লিটার ১ দশমিক ৩৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে বোরো মৌসুমে সেচ ব্যয় ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বহিঃখাতের চাপ ও নীতি–চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যা লাখ লাখ পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে এই আয়ের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে রেমিট্যান্স প্রবাহ দ্রুত অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

বৈদেশিক খাতেও চাপ ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার হলেও জ্বালানির আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়লে এই রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তোলে। ইতিমধ্যেই দেশের বহিঃঋণ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, ফলে বৈশ্বিক সুদের হার ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতাও অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।

রাজস্ব খাতেও একই ধরনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপির অনুপাত প্রায় ৮ শতাংশ, যা উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম নিম্ন। ফলে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক নীতির পরিসর তুলনামূলকভাবে সীমিত। জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি ইতিমধ্যে বিশাল অঙ্কে পৌঁছেছে; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে; যা রাজস্ব ঘাটতিকে গভীরতর করবে।

শেষ কথা

ইরান যুদ্ধ হাজার মাইল দূরের হলেও তার অর্থনৈতিক ধাক্কা কয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। তেলের দাম, খাদ্যের খরচ ও প্রবাসী আয়—এই তিন সূচকেই সংকটের প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট। সরকার এখন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই নির্ধারণ করবে এই সংকট অর্থনীতির দুর্বলতা বাড়াবে, নাকি সংস্কারের সুযোগ তৈরি করবে।

করভিত্তি বাড়ানো, ভর্তুকি লক্ষ্যভিত্তিক করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শ্রমবাজারের বৈচিত্র্য—এই পদক্ষেপগুলো এখন অপরিহার্য। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কখনোই কাকতালীয় নয়; এটি সচেতন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ফল। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সংকট অনেক সময় সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই সুযোগ।

ড. গোলাম রসুল অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা।