ইরান যুদ্ধে মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি ঝুঁকিতে, পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ইরান যুদ্ধে পেট্রোডলার ব্যবস্থা ঝুঁকিতে: ডয়চে ব্যাংক

ইরান যুদ্ধে মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি ঝুঁকিতে, পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

জার্মানিভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক ডয়চে ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের আধিপত্য বা ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে পারে। গবেষক মল্লিকা সচদেবের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সংঘাত পেট্রোডলার ব্যবস্থার ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে, যা বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে ডলারের ভূমিকার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বের ওপর নির্ভরশীল।

পেট্রোডলার ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভিত্তি

১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক চুক্তির মাধ্যমে পেট্রোডলার ব্যবস্থার সূচনা হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্ববাজারে ডলারের বিনিময়ে তেল বিক্রি করবে এবং সেই অর্থ পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বর্তমানে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি বন্ড রয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো তাদের মুদ্রার মান ডলারের সঙ্গে সমন্বয় করে রাখে, যা এই ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির উপর হুমকি

ডয়চে ব্যাংকের মতে, পেট্রোডলারের মূল ভিত্তি হলো মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি। কিন্তু চলমান ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামো ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এই আস্থার সংকট তৈরি হবে। ইরান বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং কোন জাহাজ সেখান দিয়ে যাবে তা তারাই নির্ধারণ করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা ডলারে রাখা তাদের বৈদেশিক সম্পদ সরিয়ে নিতে উৎসাহিত হতে পারে।’ এই পরিস্থিতি ডলারের বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিকল্প মুদ্রার উত্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে তেলের বাজারে ডলারের বিকল্প ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। চীন এখন রাশিয়া থেকে ইউয়ান ও রুবলের বিনিময়ে তেল-গ্যাস কিনছে, যা পেট্রোডলার ব্যবস্থার জন্য একটি নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরানের তেলের ৯০ শতাংশই যায় চীনে, এবং সৌদি আরবের তেলেরও বড় গ্রাহক চীন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ ভবিষ্যতে ‘পেট্রোডলারের আধিপত্য ক্ষুণ্ণ হওয়ার এবং পেট্রোইউয়ানের যাত্রা শুরুর অনুঘটক’ হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

মার্কিন নেতৃত্বের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রভাব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এখন আর হরমুজ প্রণালির প্রয়োজন নেই কারণ তারা জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। তিনি বলেছিলেন, ইউরোপ, কোরিয়া, জাপান ও চীনের এই পথটি প্রয়োজন, এবং তাদেরই এখন এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এই মন্তব্য পেট্রোডলার ব্যবস্থায় মার্কিন ভূমিকা হ্রাসের সম্ভাবনা নির্দেশ করে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নতুন কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করতে পারে। ডয়চে ব্যাংকের এই প্রতিবেদনটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।