ইরানে সংঘাতের আড়ালে ডিজিটাল বিপ্লব: ক্রিপ্টোকারেন্সি হয়ে উঠেছে জিয়নকাঠি
ইরানে সংঘাতের আড়ালে ক্রিপ্টোকারেন্সি জিয়নকাঠি

ইরানে সংঘাতের আড়ালে ডিজিটাল বিপ্লব: ক্রিপ্টোকারেন্সি হয়ে উঠেছে জিয়নকাঠি

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার ২৮তম দিনে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে চলেছে। পর্দার আড়ালে সংঘাতের মধ্যেই ইরানে ব্যাপক হারে বাড়ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার। এই ডিজিটাল মুদ্রা দেশটির জন্য হয়ে উঠেছে এক ধরনের জিয়নকাঠি, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

লাখো ডলারের লেনদেন ও শাসকগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা

সংঘাত শুরুর প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই ইরানের বিভিন্ন মুদ্রা বিনিময় প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১ কোটি ডলার মূল্যমানের ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন হয়েছে। ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান চেইনালিসিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চের মধ্যে এই লেনদেন ঘটেছে। মাত্র ৫ মার্চের মধ্যেই এই তহবিলের এক তৃতীয়াংশ বিদেশি এক্সচেঞ্জগুলোতে পৌঁছে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানে ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন বৃদ্ধির পেছনে মূলত দুইটি কারণ কাজ করছে:

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • প্রথমত, দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা আন্তর্জাতিক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই পথ বেছে নিয়েছেন।
  • দ্বিতীয়ত, বেসামরিক মানুষও বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন।

চেইনালাইসিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ লেনদেনের একটি বড় অংশ এসেছে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর বেশ কয়েকটি ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে। মজার বিষয় হলো, দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকা অবস্থায়ও রক্ষীবাহিনীর ওয়ালেটে লেনদেন অব্যাহত ছিল। গত বছর শুধুমাত্র ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর ওয়ালেটগুলোতেই তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের ক্রিপ্টোকারেন্সি যোগ করা হয়েছে, যা দেশটির মোট ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অর্ধেকেরও বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছায়া ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ

দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে ইরান প্রথাগত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সেবা থেকে বঞ্চিত। এই পরিস্থিতিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি হয়ে উঠেছে একটি কার্যকর বিকল্প মাধ্যম। মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইরান এই ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বিক্রি করছে এবং গোপনে ইয়েমেনের হুতি বা ফিলিস্তিনের হামাসের মতো সশস্ত্র মিত্র গোষ্ঠীর অর্থায়ন করছে।

এ বছরের শুরুতে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ফাইন্যানশিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময়ে ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্র বিক্রি করছে। অর্থ পাচার বিরোধী প্রতিষ্ঠান এসিএএমএস-এর কর্মকর্তা ক্রেইগ টিমের মতে, এসব ডিজিটাল সম্পদ ইরানের ‘ছায়া ব্যাংকিং’ কার্যক্রমের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

টিম জানান, "ব্যাংক ট্রান্সফারের তুলনায় ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন অপেক্ষাকৃত দ্রুত করা যায় এবং এর খরচও কম। পাশাপাশি, বৈশ্বিক নীতিমালার ঘাটতির কারণে এসব ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নজর রাখাও খুব একটা সহজ নয়।"

জিয়নকাঠি হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সির ভূমিকা

ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত ‘স্থিতিশীল’ ডিজিটাল মুদ্রাকে প্রাধান্য দেয়, যার মূল্যমান ডলারের বিপরীতে নির্ধারিত হয়। তবে বেসামরিক নাগরিকরা বিটকয়েনের মতো জনপ্রিয় মুদ্রায় বেশি ঝুঁকছেন, কারণ এগুলো সহজেই ডলারে রূপান্তর করা যায় এবং ব্যক্তিগত ওয়ালেটে সঞ্চিত রাখা যায়।

সংঘাত শুরুর আগেই ইরানে মূল্যস্ফীতি ৫০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময়ও অনেক ইরানি তাদের সঞ্চিত অর্থ শাসকগোষ্ঠীর নাগাল থেকে সরিয়ে রাখতে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করেছেন। বিশ্লেষক মার্টিনের মতে, "একদিকে যেমন ইরানের রিয়াল মুদ্রা মূল্যহীন হয়ে পড়ছে, অপরদিকে দেশটির জনগণের জন্য ‘জিয়নকাঠি’ হিসেবে কাজ করছে ক্রিপ্টোকারেন্সি।"

মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই এখনো ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু ইরানের জন্য এই ডিজিটাল মুদ্রা আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সামরিক সংঘাতের মধ্যেই এই ডিজিটাল বিপ্লব ইরানের অর্থনৈতিক টিকে থাকার কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।