মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সত্ত্বেও স্বর্ণের দাম কমছে: আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের শক্তিশালী অবস্থান ও সুদহারের প্রভাব
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই স্বর্ণের দামের ঊর্ধ্বমুখী ধারা কার্যত থেমে গেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে উল্টো দামে সংশোধন বা পতনের প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধারণত বৈশ্বিক সংঘাত বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা সোনার চাহিদা ও দাম দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এবার সেই প্রচলিত প্রবণতা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, যা বাজার বিশ্লেষকদের জন্য বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ডলারের শক্তি ও সুদহারের চাপে স্বর্ণের বাজার
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের উচ্চ সুদহার নীতি স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ সোনা থেকে অর্থ সরিয়ে সুদভিত্তিক আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন, যা স্বর্ণের দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ায় বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার আভাসও তৈরি হয়েছে, যার ফলে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদের প্রতি তাৎক্ষণিক চাহিদা কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। সব মিলিয়ে বলা যায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্বর্ণের দাম আর নতুন করে বাড়েনি, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও আর্থিক বাস্তবতার কারণে স্বর্ণের বাজারে বর্তমানে এক ধরনের সংশোধনধর্মী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের পতন
এই যুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে টানা ঊর্ধ্বগতি ছিল, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে হঠাৎই বড় ধরনের সংশোধন দেখা দিয়েছে স্বর্ণের বাজারে। গত তিন সপ্তাহে দেশের বাজারে ভরিপ্রতি স্বর্ণের দাম প্রায় ৩৬ হাজার টাকা কমেছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য হ্রাস। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উল্লেখযোগ্য পতনের প্রভাবেই দেশীয় বাজারে এই নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (২৫ মার্চ) দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরিপ্রতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার টাকা। অথচ চলতি মাসের ৩ মার্চ একই স্বর্ণের দাম ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা, অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই ভরিপ্রতি দাম কমেছে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। মার্চ মাসের ১ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বাজুস মোট ১২ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করেছে, যার মধ্যে ১০ বারই দাম কমানো হয়েছে, যা বাজারে সাম্প্রতিক সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পতন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
দেশীয় বাজারে দামের এই পতনের মূল কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। গত একমাসে বিশ্ববাজারে সোনার দামে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে, যেখানে আউন্সপ্রতি সোনার দাম কমেছে প্রায় ৮০১ ডলার ৪৭ সেন্ট, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। ভরির হিসাবে এই পতন দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের বড় সংশোধনের প্রভাব দ্রুত দেশীয় বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) নিউইয়র্কের বাজারেও সোনার দাম আরও কমে, এদিন আউন্সপ্রতি দাম কমেছে ৫২ ডলার ৪৯ সেন্ট বা ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নেমে আসে ৪ হাজার ৩৪৭ ডলারে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক পতনের পরও ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় সোনার দাম এখনও অনেক বেশি অবস্থানে রয়েছে, কারণ গত বছর বিশ্ববাজারে সোনার দামে বড় উত্থান হয়েছিল এবং বছরজুড়ে দাম ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়।
ভবিষ্যৎ বাজার ও বিনিয়োগকারীদের নজর
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের বাজার এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আবার তীব্র হয় বা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আবারও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা অল্প সময়ের মধ্যেই সোনার চাহিদা ও দাম আবার বাড়াতে পারে। দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহিন মনে করেন, বর্তমান দামের পর্যায়ে স্বর্ণে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে, কারণ বিশ্বের বিভিন্ন মুদ্রার ওপর আস্থা কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সোনার মতো নিরাপদ সম্পদের দিকে ঝুঁকেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের সংশোধন হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতি, ডলারের শক্তি, সুদহার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর এই বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে। এ কারণে বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের নজর এখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেই, কারণ এসব পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে আগামী দিনে সোনার বাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে, নাকি নিম্নমুখী প্রবণতা আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে।



