মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মীদের জন্য কঠোর ভিসা নিয়ম, বেতন দ্বিগুণ ও মেয়াদ সীমিত
মালয়েশিয়াকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের ঘরবাড়ি মনে করে আসছেন ভারতীয় ব্যবসায়িক পরামর্শক সঞ্জিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির মনোরম জলবায়ু, আন্তরিক মানুষ এবং উন্নত জীবনযাত্রার সঙ্গে তিনি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্ত সঞ্জিতসহ হাজার হাজার বিদেশি কর্মীর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ
বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা কমাতে মালয়েশিয়া সরকার অভিবাসন আইনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী জুন মাস থেকে বিদেশি কর্মীদের ভিসা পাওয়ার জন্য ন্যূনতম বেতনের সীমা প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের অবস্থানের মেয়াদও ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর।
নতুন বেতন কাঠামো ও কর্মীদের প্রতিক্রিয়া
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কর্মসংস্থান পাসের তিনটি ক্যাটাগরিতেই বেতনের ন্যূনতম সীমা বাড়ানো হয়েছে। প্রথম ক্যাটাগরিতে মাসিক বেতন ১০ হাজার রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার রিঙ্গিত (প্রায় ৫ হাজার মার্কিন ডলার) করা হয়েছে। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার রিঙ্গিত এবং তৃতীয় ক্যাটাগরিতে ৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার রিঙ্গিত করা হয়েছে।
এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছেন ২৮ বছর বয়সী ব্রিটিশ সম্পদ ব্যবস্থাপক থমাস মিড, যিনি কুয়ালালামপুরে স্থায়ী হওয়ার জন্য সম্পত্তিও কিনেছেন। মিড বলেন, "আগেও নিয়ম ছিল, কিন্তু ১০ হাজার থেকে এক লাফে ২০ হাজার রিঙ্গিত করার বিষয়টি সত্যিই বড় ধাক্কা। এটি অনেক বিদেশি কর্মীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে।"
মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক পটভূমি ও সরকারের লক্ষ্য
১৯৬০-এর দশকে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়। বর্তমানে দেশটিতে ২১ লাখ নিবন্ধিত বিদেশি কর্মী রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তবে উচ্চবেতনের বিশেষজ্ঞ কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার।
২০২৫ সালে প্রকাশিত ১৩তম মালয়েশিয়া পরিকল্পনায় সরকার সতর্ক করেছে যে, স্বল্প দক্ষ বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা প্রযুক্তির প্রসারে বাধা দিচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে মোট শ্রমশক্তিতে বিদেশি কর্মীদের অনুপাত ১৪.১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর মাধ্যমে স্থানীয়দের নিয়োগ বৃদ্ধি এবং গড় আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সম্ভাব্য প্রভাব
সিঙ্গাপুরের একজন উদ্যোক্তা ডগলাস গান মনে করেন, এই ঢালাও নিয়ম সব শিল্পের জন্য ভালো হবে না। তিনি জানান, "চীন বা অন্যান্য দেশ থেকে আসা প্রকৌশলী যারা আগে কম বেতনে কাজ করতে পারতেন, এখন তাদের জন্য কোম্পানিগুলো ১০ হাজার রিঙ্গিত খরচ করতে চাইবে না। এতে খরচ বেড়ে যাবে এবং প্রতিযোগিতামূলকতা কমে যেতে পারে।"
কেনাঙ্গা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের অর্থনৈতিক গবেষণা প্রধান ওয়ান সুহাইমি বলেন, "দীর্ঘমেয়াদি লাভ তখনই হবে যখন মালয়েশিয়া নিজেই দক্ষ জনশক্তি সরবরাহ করতে পারবে। শুধু অভিবাসী ঠেকিয়ে লাভ হবে না, বরং স্থানীয়দের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ জরুরি।"
বিদেশি কর্মীদের বিকল্প গন্তব্য ও ভবিষ্যৎ
কড়াকড়ির ফলে অনেক দক্ষ কর্মী এখন মালয়েশিয়ার বদলে ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর কথা ভাবছেন, যেখানে অভিবাসীদের জন্য নীতিগুলো কিছুটা শিথিল। সঞ্জিত বলেন, "যদি মালয়েশিয়া এভাবে নীতি চালিয়ে যায়, তবে আমার মতো মানুষ বিকল্প দেশ খুঁজবে, যা দেশটির জন্য দক্ষ জনশক্তির ক্ষতি হতে পারে।"
তবে ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জশুয়া ওয়েবলির মতো কেউ কেউ মনে করেন, যাদের হাতে প্রকৃত দক্ষতা আছে তাদের জন্য মালয়েশিয়া সবসময়ই উজ্জ্বল গন্তব্য হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, "এক বছর পর এই নতুন নিয়মই সবার কাছে স্বাভাবিক মনে হবে, এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।"



