মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা ও বাংলাদেশের ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানির বাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুসারে, প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
একই সঙ্গে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রধান সরবরাহকারী। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বা সামরিক উত্তেজনা শুধু তেলের বাজারকেই নয়; বরং পুরো বৈশ্বিক জ্বালানির সরবরাহশৃঙ্খলের স্থিতিশীলতাকেই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ
এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। কারণ, আমরা আমদানি করা জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, পরিবহন ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল এবং এলএনজির ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি।
ফলে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বৈশ্বিক তেলের দামে ওঠানামা ও প্রভাব
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যদিও পরে কিছুটা কমে আসে। এই মূল্যবৃদ্ধি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরও তীব্র; কারণ, দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশে এ প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে; কারণ, খাদ্য পরিবহন, সেচ এবং অনেক শিল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রভাব
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১২ মার্চ দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিপিএম৬ পদ্ধতিতে) ছিল ২৯ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার।
আন্তর্জাতিক তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, যা রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং বিনিময় হার অস্থিতিশীল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
রাজস্ব খাত ও ভর্তুকির চাপ
রাজস্ব খাতেও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক দামের ওঠানামা থেকে ভোক্তাদের রক্ষা করতে জ্বালানি ভর্তুকি ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু এই ভর্তুকির একটি বড় আর্থিক মূল্য রয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে। ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে ভর্তুকি বাড়ালে বাজেটঘাটতি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং আর্থিক নমনীয়তা কমে যায়। ইতিমধ্যে গত কয়েক বছরে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে মোট ভর্তুকি ব্যয় উচ্চ অবস্থানে ছিল, যা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়।
বিকল্প জ্বালানি উৎস ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
এ প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা জরুরি। বাংলাদেশ প্রধানত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতার থেকে তেল ও এলএনজি আমদানি করে। এ নির্ভরতা কমাতে আমদানি উৎসের বৈচিত্র্য করা প্রয়োজন।
স্বল্প মেয়াদে ভারত ও চীন থেকে পরিশোধিত ডিজেল আমদানি একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে, বিশেষত ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে পারে।
উচ্চ মূল্যের জ্বালানি আমদানির অর্থায়নও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন বাংলাদেশকে তেল ও গ্যাস আমদানিতে সহায়তা দিয়ে আসছে।
জ্বালানি ব্যবহারের কাঠামো ও নীতিগত পদক্ষেপ
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবহারের কাঠামো বোঝাও গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল মূলত কৃষিক্ষেত্রে সেচ, পরিবহন, শিল্পক্ষেত্রে জেনারেটর ও কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। পেট্রল ও অকটেন মূলত ব্যক্তিগত যানবাহনে ব্যবহৃত হয়।
ফার্নেস অয়েল নির্দিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয় আর এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিদ্যুৎ, শিল্প ও সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি, পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বল্প মেয়াদে কৌশলগত জ্বালানির মজুত বাড়ানো, বিকল্প সরবরাহের উৎস নিশ্চিত করা এবং জরুরি খাতগুলোয় জ্বালানির সরবরাহ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে অনিশ্চিত স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহচুক্তি বাড়ানো উচিত। মধ্য মেয়াদে জ্বালানি সংরক্ষণ অবকাঠামো শক্তিশালী করা, জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানের গুরুত্ব
বর্তমান সংকট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। বাংলাদেশকে নিজস্ব জ্বালানি অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা এবং বাপেক্স ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর যৌথ উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা জরুরি।
সরকার ইতিমধ্যে নতুন অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এ উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানিকাঠামো, সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সংকুচিত আর্থিক সক্ষমতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতি বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারের অস্থিরতার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তাই এ সংকটকে কেবল সাময়িক সমস্যা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিকৌশল পুনর্বিবেচনার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, আর্থিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দেশীয় অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বৈশ্বিক জ্বালানি–সংকট মোকাবিলায় আরও সক্ষম ও স্থিতিশীল হতে পারবে।



