ইরানের হামলায় কাতারের এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা, দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা
কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে গুরুতর প্রভাব ফেলছে। এই হামলার কারণে রাস লাফান থেকে এলএনজি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে, এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কাতার থেকে এলএনজি আমদানির ওপর দক্ষিণ এশিয়ার নির্ভরতা
জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর মতে, পাকিস্তান তাদের এলএনজি আমদানির ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ৭০ শতাংশ কাতার থেকে সংগ্রহ করে। অন্যদিকে, বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত তাদের এলএনজি চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি কাতার থেকে পূরণ করে। এই উচ্চ নির্ভরতার কারণে, রাস লাফানে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও উৎপাদন স্থগিত
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার তিন সপ্তাহের মাথায় এই সংঘাত শুধু জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়নি, বরং বিশ্বের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলএনজি স্থাপনা রাস লাফানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। রাস লাফান স্থাপনার পরিচালক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি চলতি মাসের শুরুর দিকে এলএনজি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন স্থগিত করেছিল, এবং সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে কোম্পানিটির অনেক বেশি সময় লাগতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সীমিত মজুত ও ঝুঁকি
কেপলার জানিয়েছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয়েরই নিজস্ব এলএনজি মজুত সীমিত, যা দিয়ে মাত্র এক বা দুই সপ্তাহ চলতে পারে। ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার এই ধাক্কায় দেশ দুটি বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এতে দেশগুলোতে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থান
পূর্ব এশিয়ায় তাইওয়ানও বেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছে, কারণ দেশটি তাদের এলএনজি চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ কাতার থেকে আমদানি করে এবং তাদের হাতে মাত্র ১১ দিনের মজুত রয়েছে। তবে তাইপে গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তারা মার্চ ও এপ্রিল মাসের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করেছে এবং মে মাসের জোগাড় ঠিক করতে কাজ করছে। অন্যদিকে, কাতার চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেও বিপুল পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করে, কিন্তু মজুত বেশি থাকায় এসব দেশ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে চীনের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় হওয়ায় দেশটি এ পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্যাংকার আটকে পড়ার ঘটনা
কাতারের রাস লাফান থেকে ৬২ হাজার টন এলএনজি নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল ‘লিব্রেথা’ নামের একটি ট্যাংকারের। তবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় ট্যাংকারটি পারস্য উপসাগরেই আটকে আছে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহে আরও বিলম্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই ঘটনা এলএনজি পরিবহনে বর্তমান সংকটের তীব্রতা তুলে ধরছে।
সিএনএনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে, কিন্তু স্বল্প মজুতের কারণে সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।



