মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে অনিশ্চয়তা, তবুও সোনার দাম কেন স্থির?
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সোনার দাম স্থির থাকার কারণ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে অনিশ্চয়তা, তবুও সোনার দাম কেন স্থির?

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ আজ বুধবার ১৯তম দিনে গড়িয়েছে। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়লেও, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সত্ত্বেও সোনার বাজারে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। সোনার দাম না বেড়ে বরং প্রায় স্থির হয়ে আছে, যা বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।

সোনার দামে কী ঘটছে?

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে প্রথম দফায় হামলা চালানোর পর থেকে এই যুদ্ধ কেবল ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুদ্ধ নিয়ে অনিশ্চয়তার জেরে গত দুই সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে চাপ দেখা গেছে, কিন্তু একই সময়ে সোনার দাম সেভাবে বাড়েনি।

বিশ্ববাজারে সোনার দাম গত বছর ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, এবং গত ২৬ জানুয়ারি আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকে সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। আজ বুধবার সকালে নিউইয়র্কের স্পট মার্কেটে সোনার দাম ছিল আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৯৯১ ডলার, যা ১০ ডলার কমেছে। অন্যদিকে এপ্রিলে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্সের দাম ৪ হাজার ৯৯৮ ডলারে উঠেছে।

সোনার দাম স্থির থাকার কারণ

সাধারণত অর্থনৈতিক সংকট বা বিশ্বব্যাপী সংঘাতের সময় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সোনার দিকে ঝোঁকেন, ফলে সোনার মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর সোনার দাম দ্রুত বেড়ে যায়। তবে বর্তমান যুদ্ধের সময় সোনার বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা ধারণা করছেন যে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর ধারায় ছেদ টানতে পারে, এমনকি সুদের হার বাড়াতেও পারে। এতে ডলারে বিনিয়োগ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, এবং সাধারণত ডলারের আকর্ষণ বাড়লে সোনার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ে বলেন, "বিনিয়োগকারীরা কিছুদিন ধরেই প্রত্যাশা করছেন, সুদের হার কমবে। আরেকটি কারণ হলো, বছরের শুরু থেকেই সোনার দাম বেশ চড়া ছিল।"

ব্রুগেল থিঙ্কট্যাংকের জ্যেষ্ঠ ফেলো রেবেকা ক্রিস্টির পর্যবেক্ষণও সে রকম। তাঁর মতে, এ বছর সোনা ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে, এবং ডলার শক্তিশালী হওয়াও তার একটি বড় কারণ। যেহেতু সোনার লেনদেন ডলারে হয়, সেহেতু ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ডলার নিজেও বিকল্প ও নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে, বিশেষ করে তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কায় ডলার আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

সোনা এখন কি নিরাপদ বিনিয়োগ?

এই মুহূর্তে সোনা ততটা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। প্যারিসভিত্তিক ফরাসি আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ রেমি বুরজোর ভাষায়, "দুই বছর আগের মতো অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে সোনাকে এখন আর ততটা নির্ভরযোগ্য মনে করা হচ্ছে না।" তিনি আরও বলেন, এখন অনেকেই সোনাকে জল্পনানির্ভর সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছেন, এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো বড় বিনিয়োগকারীরা বর্তমান বাজারের অস্থিরতায় কিছুটা সতর্ক হয়ে থাকতে পারে।

সামনের দিকনির্দেশনা

মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সোনার দামের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা দেওয়া কঠিন। রেবেকা ক্রিস্টির মতে, আপাতত সোনার দাম আরও না বাড়ার বড় কারণ হলো, দাম আগেই অনেকটা বেড়ে আছে। জেমস মিডওয়ের মতে, সোনার দামে বড় পরিবর্তন ঘটতে হলে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, ফেডারেল রিজার্ভ যদি স্পষ্টভাবে জানায় যে মূল্যস্ফীতির চাপ থাকা সত্ত্বেও সুদের হার কমানো হবে; দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয়—এই ধারণায় পরিবর্তন এলে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকলে সোনা আবারও বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। তবে আপাতত সোনার বাজারে বড় ধরনের উত্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই, এবং বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে।