যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশ: অতি উৎপাদন ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে শুল্কের ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশ: অতি উৎপাদন ও জোরপূর্বক শ্রম

যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশ: অতি উৎপাদন ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগে শুল্কের ঝুঁকি

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতি উৎপাদন এবং জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কিনা, তা তদন্ত করতে শুরু করেছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বুধবার (১১ মার্চ) অতি উৎপাদনের বিষয়ে বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের ওপর তদন্ত শুরুর কথা জানায়। পরে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) তারা বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে তদন্তের ঘোষণা দেয়।

তদন্তের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিয়েসন গ্রির বলেছেন, এ তদন্তের মাধ্যমে যেসব দেশের বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেসব দেশের পণ্যের ওপর আমদানি কর আরোপ করা সম্ভব হবে। জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে তদন্তের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখবেন যে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বিক্রি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়ে এসব দেশ মার্কিন ব্যবসার ক্ষতি করছে কিনা।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিলেন, জুলাইতে সেগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এসব তদন্ত শেষ করতে চায়। তদন্তের আওতায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের নামও রয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাতিল হয়ে যাওয়ার পর দেশটি এসব তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।

তদন্তে কী দেখবে যুক্তরাষ্ট্র?

ইউএসটিআর বৃহস্পতিবার বলেছে, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার থাকলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কেমন সেটি এই তদন্তে দেখা হবে। একই সঙ্গে দেখা হবে যে, এসব বিষয়ে দেশগুলোর নীতি বা চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের বোঝা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কিনা। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি সরকারের নীতি বা কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে সরকারের বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান শুক্রবার (১৩ মার্চ) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত শুরু করলেও এতে বাংলাদেশের জন্য কোনো ঝুঁকি দেখছেন না তারা। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রশ্ন বা তথ্য চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের নাম কেন তদন্তে?

বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেওয়ায় বিকল্প হিসেবে শুল্ক বা কর আরোপের জন্য এই পন্থা বেছে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর পালটা শুল্ক আরোপ করা হয়, যা পরে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়। সবশেষ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৩ দিন আগে বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং এআরটিও কার্যকর হয়নি।

এজন্যই কর আরোপের বিকল্প উপায় হিসেবেই বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে অতি উৎপাদন সক্ষমতা ও জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, তদন্তে অতি উৎপাদন সক্ষমতা কিংবা জোরপূর্বক শ্রমের প্রমাণ পেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী, দেশটির সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর কর আরোপ করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের বলেন, যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি বেশি হয় তারা সেসব দেশকেই এই তদন্তের আওতায় রেখেছে এবং বাংলাদেশ পোশাক খাতের অন্যতম রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই এই তালিকায় এসেছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত দেখবে যে ভর্তুকি, বিশেষ সুবিধা কিংবা সস্তা শ্রমের অপব্যবহার করে কোনো পণ্যের উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখা হচ্ছে কিনা, যা মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতা করতে বাধা সৃষ্টি করে।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে বলে তারা এসব করতেই পারে, কিন্তু তারা যে অতি উৎপাদন সক্ষমতার কথা বলছে, তার সংজ্ঞা অস্পষ্ট। বাজার অর্থনীতিতে উৎপাদকরা চাহিদার ভিত্তিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে রাখতে পারে, যা স্বাভাবিক।

বাণিজ্য সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার, দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেখানে বছরে রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য, বিপরীতে আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ আমেরিকা ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশ থেকে বেশি কেনে। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা পরে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে। এরপর দেশটি চাপ প্রয়োগ করে বাংলাদেশসহ অনেক দেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে, কিন্তু গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যেই চুক্তি হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশ তা পারেনি।

গবেষকদের ধারণা, মূলত তৈরি পোশাক খাতকে ক্ষতি থেকে রক্ষার চিন্তা থেকেই বাংলাদেশকে এমন চুক্তি মেনে নিতে হয়েছে, তবে এই চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্র যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।