ইউরোপে বাংলাদেশি পোশাকের দাম বেশি, এলডিসি উত্তরণে বড় চ্যালেঞ্জ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা ইউরোপীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় গড়ে ১০ শতাংশের বেশি দাম পান। এই দামের পার্থক্যের মূল কারণ হলো দুই বাজারে শুল্ককাঠামোর পার্থক্য এবং অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা। তবে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ঘটালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) এই সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সুরক্ষাব্যবস্থার কারণে প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে।
গবেষণার তথ্য উপস্থাপন ও পরামর্শ সভা
আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে 'তৈরি পোশাকশিল্পে এলডিসি–পরবর্তী প্রভাব' শীর্ষক এক পরামর্শ সভায় এই গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে র্যাপিডের উপপরিচালক ও উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের প্রভাষক জিল্লুর রহমান জানান, ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শুল্ক বিভাগের প্রায় ৩ হাজার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে প্রায় ৪৫ শতাংশ পোশাক কারখানা উভয় বাজারে পণ্য রপ্তানি করে এবং প্রধান পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে গড়ে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপে বেশি দাম পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, টি–শার্ট রপ্তানিতে জার্মানিতে ২০–২৭ শতাংশ এবং ট্রাউজার রপ্তানিতে ৯–১৫ শতাংশ বেশি দাম আদায় করা সম্ভব।
দুই বাজারে চাপ ও প্রতিযোগিতা
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্রেতাদের কাছ থেকে ৩০–৩৫ শতাংশ বেশি দাম আদায় করতে পারে। আবার যারা বেশি সংখ্যক দেশে রপ্তানি করে, তারা ইউরোপে ১–৩ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৪–৫ শতাংশ বেশি দাম পায়। অন্যদিকে, শুধু একধরনের পণ্য রপ্তানি করলে ১০–১৩ শতাংশ কম দাম পাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। জিল্লুর রহমান বলেন, ভিন্ন বাণিজ্য ব্যবস্থা সত্ত্বেও বাংলাদেশ উভয় বাজারেই রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পেরেছে, তবে ইইউতে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধার কারণে অবস্থান শক্তিশালী, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের চাপ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান বলেন, 'গত ৫০ বছরে আমরা বিকল্প বাজার বা পণ্যের প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারিনি। এখন রপ্তানিনির্ভর বিনিয়োগ জরুরি। এলডিসি উত্তরণে প্রস্তুতি না নিলে এবং অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা হারালে অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতে বড় আঘাত আসবে।' ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আকতার পণ্য ও বাজারে বৈচিত্র্যের অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্য নীতি উপদেষ্টা হাফিজুর রহমান বাংলাদেশকে লো-কস্ট থেকে হাই-প্রাইস ব্র্যান্ডে রূপান্তরের পরামর্শ দেন, যা দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বাড়াবে। বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো বদরুন্নেসা আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের বৈচিত্র্যময়তা এবং ইইউর প্রতিযোগিতামূলক চাপের দিকটি তুলে ধরেন।
ভবিষ্যতের পদক্ষেপ
গবেষণায় এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে:
- ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুবিধাজনক বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করা।
- নতুন সম্ভাবনাময় বাজারে অনুকূল বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের জন্য আলোচনা ত্বরান্বিত করা।
- প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়া।
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে তার অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে এবং এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে পারবে।
