যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তদন্ত: রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন রূপ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২ এপ্রিল বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন। বিশ্ব বাণিজ্যের ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, বড় শক্তিগুলো নীতির ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘অতি উৎপাদন’ ও ‘জোরপূর্বক শ্রম’ নিয়ে যে তদন্ত শুরু করেছে, তা শুধু শ্রম অধিকার বা ন্যায্য প্রতিযোগিতার প্রশ্ন নয়; বরং এর পেছনে বড় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট আছে।
বাণিজ্য ঘাটতি ও নীতিনির্ধারণের চাপ
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির মুখে রয়েছে, তা কমানোর চাপ এখন তাদের নীতিনির্ধারণে আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো দেশের ‘অতি সক্ষমতা’ অন্তরায় হয়ে উঠছে। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানি দ্রুত বেড়েছে, অথচ একই গতিতে রপ্তানি বাড়েনি। দেশটি বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যে আছে। যদিও সেবা রপ্তানিতে তাদের উদ্বৃত্ত আছে। এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নানা উপায়ে আমদানি কমানো এবং দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দেওয়ার পথ খুঁজছেন। ‘অতি উৎপাদন’, ‘ডাম্পিং’, ‘জোরপূর্বক শ্রম’ কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলের নৈতিকতার মতো বিষয়গুলো ক্রমেই বাণিজ্যনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের উৎপাদন ও তদন্তের প্রেক্ষাপট
দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের উৎপাদন ও শ্রমব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটা প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশে জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেও তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের শ্রম পরিবেশ ও মজুরি নিয়ে অনেক সমালোচনা থাকলেও জোরপূর্বক শ্রমে পণ্য উৎপাদন হয়— এমন অভিযোগ কখনো ওঠেনি। অন্যদিকে অতি উৎপাদনের সংজ্ঞা অপরিস্কার। ফলে এসব বিষয়ে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে শক্ত যুক্তি বাংলাদেশের আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক অতি উৎপাদন
যুক্তরাষ্ট্র নিজেও অতি উৎপাদন করেছে বাস্তবতা হলো, ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও ‘অতি উৎপাদনের অভিযোগ উঠেছিল, বিশেষ করে কৃষি ও কিছু শিল্প খাতে তাদের উৎপাদন আধিপত্যের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এসব অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা গেলেও অন্য দেশের বিরুদ্ধে এখন যে ধরনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত (বাংলাদেশসহ ১৬ দেশের বিরুদ্ধে যা হচ্ছে) হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন নিজে তেমন প্রক্রিয়ার মুখে পড়েনি; বরং ১৯৩০-এর যে মহামন্দা, এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অতি উৎপাদনের সম্পর্ক আছে। ১৯২০-এর দশকে যান্ত্রিকীকরণ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতে বড় ধরনের অতি উৎপাদন হয়। উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষিপণ্যের দাম ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। একই সময়ে দ্রুত শিল্পায়নের ফলে গাড়ি ও ভোক্তাপণ্যের মতো খাতে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে স্মুথ হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট পাস করে যুক্তরাষ্ট্র আমদানি শুল্ক প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। উদ্দেশ্য ছিল, অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় দেশীয় বাজারকে সুরক্ষা দেওয়া। বলা যায়, পাল্টা শুল্ক আরোপের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংকুচিত হয় এবং মহামন্দা আরও গভীর হয়।
মুক্তবাণিজ্যের বাস্তবতা ও বৈপরীত্য
মুক্তবাণিজ্য মুক্ত নয় বিশ্বায়ন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই মুক্তবাণিজ্যের ধারণাটি সামনে আসে। তত্ত্বগতভাবে বলা হয়, বাজার উন্মুক্ত হলে পণ্য, সেবা ও পুঁজি অবাধে চলাচল করবে এবং এর ফলে বৈশ্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। বাস্তবেও দেখা গেছে, ১৯৯০-এর দশকের পর বিশ্বায়ন দ্রুততর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি আরেকটি বৈপরীত্যও দেখা যায়। সেটা হলো, মুক্তবাণিজ্যের কথা বললেও শক্তিশালী অর্থনীতিগুলো প্রায়ই নিজেদের শিল্প ও কৃষিকে সুরক্ষা দিতে নানা ধরনের নীতি গ্রহণ করে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিৎস মনে করিয়ে দেন, বাণিজ্য উদারীকরণ বিশ্বায়নের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাস্তবে কখনো পুরোপুরি মুক্ত ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজার উন্নত দেশের পণ্যের জন্য খুলে দেওয়া হলেও সমানভাবে পাল্টা সুবিধা নিশ্চিত করা হয়নি। আবার ছোট দেশগুলো যে তার সুবিধা নেবে, তাদের সেই সক্ষমতা বিকশিত হয়নি। দেখা গেছে, শুল্ক কমনো হলেও মাননিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিডাম্পিং ব্যবস্থা, ভর্তুকি কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার মতো অশুল্ক বাধা রেখে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাণিজ্য উদারীকরণের সুবিধা সব দেশ সমানভাবে পায় না।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাধিকারমূলক সুবিধা
জোসেফ স্টিগলিৎস মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পৃথকভাবে দেখতে হবে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় এই বিষয়টি উন্নত দেশের মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এই উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত দেশের কথা না শোনে, তাহলে উন্নত দেশগুলো এদের দেওয়া প্রাধিকারমূলক সুযোগ-সুবিধা ফেরত নিতে পারে। বিষয়টি এখন উন্নত দেশগুলোর হাতে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে গেছে। স্টিগলিত্স বলেন, স্রেফ একটি সংস্কার এর প্রতিকার করতে পারে। সেটা হলো, উন্নত দেশগুলোকে প্রতিদানের আশা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত ছাড়াই স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাজার খুলে দিতে হবে। অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশকেও সে এই সুবিধা দিতে পারবে—এমন বিধানও থাকবে। তবে অন্য উন্নত দেশগুলোকে সে এই সুবিধা দিতে পারবে না। মধ্যম আয়ের দেশগুলোকেও এই কাজ করতে হবে। তবে তারাও উন্নত দেশকে এই সুবিধা দিতে পারবে না, এতে তাদের শিল্পের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ শুধু সমতা নয়, ন্যায়সংগতভাবে প্রাধিকারমূলক সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
