হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আক্রমণ বৃদ্ধি: তেল বাজার ও ভূরাজনীতির নতুন দিক
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আক্রমণ: তেল বাজার ও ভূরাজনীতি

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ আক্রমণ বৃদ্ধি: তেল বাজার ও ভূরাজনীতির নতুন দিক

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ও পণ্যবাহী জাহাজে আক্রমণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই সংকটের প্রভাব কেবল সামরিক নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

অর্থনৈতিক পেশাজীবনের অভিজ্ঞতা ও তেলসংকট

১৯৭০-এর দশকের দ্বিতীয় তেলসংকট (১৯৭৯-১৯৮২) শেষ হওয়ার ঠিক পরই একজন অর্থনীতিবিদ পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক) এবং তাদের আর্থিক উদ্বৃত্তের পুনর্বিনিয়োগ। সে সময় তার অফিসের একজন ইরানি সহকর্মী ছিলেন, যিনি ইসলামি বিপ্লবের পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্তমান সংকটকে বুঝতে সহায়তা করে।

পিএইচডি গবেষণায় একটি সম্পদ-বণ্টন মডেল ব্যবহার করা হয়েছিল, যা অনুযায়ী গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) দেশগুলোকে 'লো অ্যাবজর্বার' হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। কারণ, তাদের তেল আয়ের পুরোটাই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। বিপরীতে, নাইজেরিয়ার মতো 'হাই অ্যাবজর্বার' দেশগুলোর পুনর্বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত। সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিলের প্রাথমিক যুগ ছিল, কিন্তু এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

জ্বালানি বাজারের পূর্বাভাস ও স্থিতিস্থাপকতা

মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো: কোনো বড় ধাক্কার এক মাস পর তেলের দাম প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে মিলে না। বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠবে, কিন্তু বাস্তবে দাম দ্রুত নেমে আসে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিম্নমুখী থাকে। জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি, যেখানে দাম বাড়লে সরবরাহ ও চাহিদা উভয় দিক থেকে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

বর্তমান পরিস্থিতিতেও এই যুক্তি প্রযোজ্য। যেসব দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা বিকল্প শক্তির দিকে এগিয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। অন্যদিকে, যারা পিছিয়ে আছে, তারা এখন উদ্যোগ নিতে পারে। ফলে, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদকদের ধারণা করা উচিত নয় যে দাম অনির্দিষ্টকাল ধরে উচ্চ অবস্থায় থাকবে।

রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শিক্ষা

এই সংকট থেকে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শিক্ষা উঠে এসেছে:

  1. ইরানের ভবিষ্যৎ: ইরানে শিগগিরই শান্তিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ বিপ্লব হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে, যদি আরও সহনশীল ও উদার সরকার গড়ে ওঠে, তা ইরানের ৯ কোটি মানুষ এবং পুরো অঞ্চলের জন্য উপকারী হবে।
  2. চীনের ভূমিকা: ১৯৯৭-৯৮ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকটে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এবারও চীন প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা করতে পারে, বিশেষ করে যেহেতু উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল কেনা বড় দেশগুলোর একটি হলো চীন। তারা ব্রিকস+ জোটকে কাজে লাগাতে পারে।
  3. বিশ্ব সম্পর্কের পরিবর্তন: নাইন–ইলেভেন হামলার পরের সময় থেকে বিশ্বের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বদলে গেছে। উপসাগরীয় জিসিসি দেশগুলো ধীরে ধীরে চীন, ভারত ও অন্য উদীয়মান শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর থেকে দূরত্ব বাড়াতে পারে।

এই যুদ্ধ যদি কোনো শিক্ষা দিয়ে থাকে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। বিপরীতে, উদীয়মান এশিয়ার অর্থনৈতিক সুযোগ প্রতিদিন আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। জিম ও’নিল, ব্রিটেনের সাবেক অর্থমন্ত্রী, এই বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।