হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়: মার্কিন-ইসরাইলি হামলার প্রভাব
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয়

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি। ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই কৌশলগত নৌপথটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম তৈরি হয়েছে। যা কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক ভয়াবহ মরণফাঁদে পরিণত হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতির সংবেদনশীল ধমনি

হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ ২০ শতাংশেরও বেশি, এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি সামরিক তৎপরতা এই নৌপথের নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।

জ্বালানি বাজারে ধসের আশঙ্কা

যদি ইরান তার হুমকি বাস্তবায়ন করে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তা এক ভয়াবহ ধস নেমে আসবে। জ্বালানি বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা দিচ্ছেন যে, এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। রাতারাতি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ভয়াবহ ছেদ

এই সংকটের প্রভাব শুধুমাত্র তেল বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। হরমুজ প্রণালি রুদ্ধ হওয়ার অর্থ হবে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে এক মারাত্মক ছেদ। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বিশাল অংশও এই পথ দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে শিল্পোন্নত দেশগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নত বিশ্বের শেয়ার বাজার ধসে পড়ার পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

কূটনৈতিক সমাধানের তাগিদ

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে সামরিক পাহারা জোরদার করলেও, আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির এই যুগে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। ইরান ভালো করেই জানে যে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি পারমাণবিক বোমা নয়, বরং এই ২১ মাইল চওড়া জলপথ। এই 'অর্থনৈতিক লিভারেজ' ব্যবহার করে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি আজ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানা নয়, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার পরিমাপক। যদি কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং সামরিক সংঘাত এই রুটটিকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতির গলার ফাঁস আরও শক্ত হয়ে উঠবে। বর্তমান সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যদি দ্রুত কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো না যায়, তবে ২০২৬ সাল ইতিহাসের পাতায় এক অন্ধকার অর্থনৈতিক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।