নবায়নযোগ্য শক্তির বিশ্বে ভূ-রাজনীতি: হরমুজ প্রণালির হুমকি থেকে মুক্তির স্বপ্ন
বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা চললেও, আমাদের এই পৃথিবীটি আর আগের মতো পেট্রল বা ডিজেলে চলে না। বরং পুরো বিশ্ব এখন বাতাস, সূর্যের আলো এবং অত্যাধুনিক ব্যাটারির শক্তিতে চলছে! কিন্তু কেমন হতো সেই নবায়নযোগ্য শক্তির পৃথিবীর রাজনীতি ও অর্থনীতি? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা আজকের সংকটের প্রেক্ষিতে ভাবনার খোরাক জোগায়।
জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা: হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
বর্তমানে আমাদের বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ৮০ শতাংশ শক্তি আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। এই কারণে হরমুজ প্রণালির মতো সরু সামুদ্রিক পথগুলো বিশ্ব অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের বাণিজ্য করা তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়, ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামান্য উত্তেজনা বাড়লেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুড়মুড় করে বেড়ে যায়। এর ফলে দেশে দেশে শুরু হয় মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের ঊর্ধ্বগতি, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
নবায়নযোগ্য শক্তির পৃথিবী: সংকটের প্রভাব হ্রাস
কিন্তু পৃথিবী যদি নবায়নযোগ্য শক্তিতে চলত, তবে কি উপসাগরের এই অস্থিরতা সারা বিশ্বকে এভাবে কাঁপিয়ে দিতে পারত? ভাবুন, বিশ্বজুড়ে গাড়িগুলো চলছে বিদ্যুতে, ঘর গরম করার কাজে ব্যবহার হচ্ছে হিট পাম্প, জিওথার্মাল সিস্টেম বা সবুজ হাইড্রোজেন। এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিলে কী হতো? তেলের ওপর নির্ভরতা না থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এই যুদ্ধের প্রভাব পড়ত খুবই সামান্য। আপনার ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জের খরচ বাড়ত না, মাসের বিদ্যুতের বিলও থাকত একদম হাতের নাগালে! বিশ্বের সরকারগুলোকে হঠাৎ করে জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য হিমশিম খেতে হতো না, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সাধারণ ঘটনা।
তখন কোনো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুদূর কোনো সমুদ্রপথের পাহারার ওপর নির্ভর করত না। বরং নির্ভর করত নিজেদের দেশের ভেতরে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ গ্রিড, উন্নত ব্যাটারি স্টোরেজ এবং বৈচিত্র্যময় সাপ্লাই চেইনের ওপর। এটি একটি স্থিতিশীল এবং স্বনির্ভর শক্তি ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে, যা আজকের ভঙ্গুর পরিস্থিতির বিপরীত।
নতুন সংঘাত: খনিজ সম্পদের লড়াই
তবে কি নবায়নযোগ্য শক্তির পৃথিবীতে কোনো রাজনীতি বা সংঘাত থাকত না? অবশ্যই থাকত! তখন তেলের বদলে লড়াই হতো লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলো নিয়ে। সোলার প্যানেল বা উইন্ড টারবাইন বানাতে এগুলো অপরিহার্য উপাদান, যা নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
তখন চীন (রেয়ার আর্থ), কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (কোবাল্ট) বা ইন্দোনেশিয়ার (নিকেল) মতো দেশগুলো নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠত। খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বা সেমিকন্ডাক্টর কারখানাগুলো পরিণত হতো নতুন যুগের হরমুজ প্রণালিতে, যার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।
খনিজ সম্পদের বৈশিষ্ট্য: স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা
তেলের খনিগুলো পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় কেন্দ্রীভূত, তাই হরমুজ বা সুয়েজ খালের মতো দু-একটি রাস্তার ওপর সবাইকে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু খনিজ সম্পদ অনেক বেশি ছড়ানো এবং এর দাম তেলের মতো রাতারাতি বাড়ে-কমে না, এর ধাক্কা বাজারে আসতে অনেক সময় লাগে। তাছাড়া প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ গড়ে তোলা তেলের চেয়ে অনেক বেশি সহজ, যা এই নতুন পৃথিবীতে কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে বিশ্বকে ব্ল্যাকমেইল করা অনেক কঠিন করে তুলবে।
স্থানীয় মানুষের ক্ষমতায়ন এবং পরিবেশগত বিবেচনা
তেলের যুগে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে বড় বড় বহুজাতিক তেল কোম্পানি ও গুটিকয়েক রাষ্ট্রের হাতে, যাদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের খুব একটা সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু নতুন পৃথিবীতে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা বা এশিয়ার খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর স্থানীয় মানুষের ক্ষমতা অনেক বেড়ে যেত, কারণ তাদের সম্পদ সরাসরি বৈশ্বিক শক্তি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত হবে।
বর্তমানে খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশ রক্ষার কড়া বৈশ্বিক আইন ও সামাজিক সম্মতির যে চল শুরু হয়েছে, তা তেলের যুগে কখনোই ছিল না। ফলে স্থানীয়দের মতামত ছাড়া কেউ চাইলেই তাদের সম্পদ তুলে নিয়ে যেতে পারবে না, যা একটি ন্যায়ভিত্তিক এবং টেকসই উন্নয়নের পথ দেখায়।
উপসংহার: একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে
কার্বন নির্গমন কমানো শুধু জলবায়ু বাঁচানোর জন্যই নয়, এটি বিশ্বরাজনীতিকে আরও স্থিতিশীল এবং বিকেন্দ্রীভূত করতে পারে। আজকের এই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থাটি যে কতটা ভঙ্গুর, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকট সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তির পৃথিবীতেও হয়তো ভূ-রাজনীতি বা সংঘাত থাকবে, কিন্তু তা আজকের মতো রাতারাতি পুরো বিশ্বকে স্থবির করে দিতে পারবে না! এটি একটি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ করে।
লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর
সূত্র: জেডএমই সায়েন্স



