ইরান হামলার প্রভাবে ভারতে গ্যাস সংকট, রেস্তোরাঁ-হোটেল বন্ধের আশঙ্কা
ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার পরিণতিতে ভারতে গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। এই সংকটের প্রভাবে দেশটির বিভিন্ন শহরে রেস্তোরাঁ ও হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের শহরগুলোতে বাণিজ্যিক এলপিজি সরবরাহে টান পড়ায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক গ্যাস বণ্টন পরিকল্পনা
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার একটি অগ্রাধিকার ভিত্তিক গ্যাস বণ্টন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার, পাইপবাহিত রান্নার গ্যাস এবং পরিবহন খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের সরবরাহ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, এলপিজি, সিএনজি এবং পিএনজির চাহিদার ১০০ শতাংশ পূরণ করাই সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য।
অগ্রাধিকারের দ্বিতীয় ধাপে রাখা হয়েছে সার কারখানা এবং গ্যাসের বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের। এই খাতগুলোতে মোট চাহিদার যথাক্রমে ৭০ ও ৮০ শতাংশ পূরণের চেষ্টা করা হবে। তৃতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে চা শিল্প, উৎপাদন খাত এবং অন্যান্য শিল্পগ্রাহকদের প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রগুলোতে গত ছয় মাসের গড় ব্যবহারের ৮০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চতুর্থ স্থানে রাখা হয়েছে সিটি গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোকে, যারা শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের সেবা দিয়ে থাকে।
গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি ও শহরগুলোর অবস্থা
ভারতে প্রতিদিন প্রায় ১৯ কোটি কিউবিক মিটার গ্যাস ব্যবহৃত হয়, যার অর্ধেকই আমদানিনির্ভর। হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হওয়ায় সরবরাহে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এই সংকটের ফলে দেশের ছোট-বড় সব শহরে বাণিজ্যিক গ্যাসের জোগানে টান পড়েছে। দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতা এবং বেঙ্গালুরুতে বহু হোটেল ও রেস্তোরাঁ ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
মুম্বাইয়ের হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠন ‘আহার’ সতর্ক করে জানিয়েছে যে, আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে প্রায় ৫০ শতাংশ হোটেল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। এই সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, যা ব্যবসায়ীদের চাহিদা ও জোগান খতিয়ে দেখবে।
সরকারের পরামর্শ ও বিকল্প উদ্যোগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, গ্যাসের ব্যবহার কমানোর জন্য হোটেলগুলোকে তাদের মেনু পরিবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি খরচ কম এমন সহজে রান্না করা যায়, এমন পদ তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। মোটকথা, গ্রাহকদের পছন্দ সীমিত করার মাধ্যমে গ্যাস সাশ্রয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রত্যেককে সক্রিয় ও সজাগ থাকতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে।
একই সঙ্গে বিকল্প উৎসের খোঁজ চলছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ব তেল সংস্থাগুলো রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে। গ্যাসের দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদন কমিয়ে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে শোধনাগারগুলোকে।
মজুতদারি ও কালোবাজারি রোধ করতে গৃহস্থদের জন্য সিলিন্ডার বুকিংয়ের সময়সীমা ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। এছাড়া, ১৯৫৫ সালের অত্যাবশকীয় পণ্য আইন কার্যকর করা হয়েছে, যা সংকটকালীন সময়ে জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।



