তারেক রাহমানের সরকারের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের চ্যালেঞ্জ
তারেক রাহমানের সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

তারেক রাহমানের নতুন সরকার: অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের পথে চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রাহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীও একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাদের সমর্থন লক্ষণীয়।

অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও বাস্তবতা

বিএনপি সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা অর্থনীতিকে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য। এ জন্য প্রায় ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, বর্তমানে যা ৪ শতাংশে রয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উচ্চাভিলাষী এই লক্ষ্য পূরণে সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা

জিডিপির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষ এই খাতে নিয়োজিত। শহরাঞ্চলে খাদ্যমূল্য কমানো ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দমন ও লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ জরুরি। উচ্চ সুদহার ও বণ্টনব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যা খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

রেমিট্যান্স ও শ্রম রফতানি

প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করেন, যারা বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রক্ষায় আইএমএফের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখছেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক প্রবাসী অবৈধ হুন্ডি চ্যানেল ছেড়ে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে আসায় রেমিট্যান্স নাটকীয়ভাবে বেড়েছে: ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে শ্রম রফতানি খাতে দুর্নীতি ও শোষণ বিদ্যমান, এবং কিছু দেশ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, যা সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও চ্যালেঞ্জ

তারেক রাহমানের সরকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা একটি বড় পরীক্ষা। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, বার্ষিক ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ও ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক রফতানির বৃহত্তম বাজার এবং জ্বালানি খাতে শীর্ষ বিনিয়োগকারী। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঝুঁকি তুলে ধরার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও সতর্কতা প্রয়োজন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছে, ভিসা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। দিল্লির সঙ্গে বাণিজ্যিক ও জলসম্পদ ইস্যুতে সমঝোতা সীমিত থাকতে পারে।

সামগ্রিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ বাস্তববাদী সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন, উচ্চ-প্রভাবশালী ছোট প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি শিল্পের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ বাণিজ্যিক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে। তারেক রাহমানের রাজনৈতিক সাফল্য অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের ওপর নির্ভর করবে, যেখানে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।