রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে দেশে একটি দক্ষ, সমন্বিত ও আধুনিক লজিস্টিকস ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বন্দর ব্যবস্থাপনায় ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা, উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনা
শনিবার (৯ মে) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।
ডিসিসিআই সিনিয়র সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী
বৈঠকে ডিসিসিআই’র সিনিয়র সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী বলেন, দেশের লজিস্টিক খাতের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিষ্ঠানগত সমন্বয়হীনতা রফতানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, সড়ক ও রেলপথে ধীরগতির পরিবহন ব্যবস্থা এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন সুবিধার ঘাটতির কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও মন্থর হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বন্দরগুলোতে পেপারলেস ও অটোমেটেড ব্যবস্থা চালু, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক কোল্ড-চেইন লজিস্টিকসে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
বিআইএম মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ বলেন, সমন্বিত বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এর ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়ছে। এ খাতের উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, গত চার দশকে বাংলাদেশের রফতানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও রফতানি এখনও গুটিকয়েক পণ্য ও বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই।
তিনি জানান, দেশের লজিস্টিকস ব্যয় ২৫ শতাংশ কমানো গেলে রফতানি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে পণ্য পরিবহন ব্যয় এক শতাংশ কমানো সম্ভব হলে রফতানি সাত দশমিক চার শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, দুর্বল লজিস্টিকস কাঠামো ও উচ্চ ব্যবসা ব্যয় দেশের বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে বড় বাধা। এ জন্য কার্যকর লজিস্টিক নীতিমালা বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি ও দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বন্দর পরিচালনায় সম্পৃক্ত করা, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাসের সময় কমানো এবং নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন সদস্য মো. হাবিবুর রহমান
বৈঠকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব (প্রাক্তন সদস্য, প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত। তাই পণ্য পরিবহনে রেলপথকে অগ্রাধিকার দিয়ে বন্দরগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ বাড়াতে হবে। তিনি দেশের অন্তত একটি সমুদ্রবন্দর বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালনার প্রস্তাবও দেন। এতে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি খরচ কমতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বুয়েট অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নকে সমন্বিত না করা গেলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি বলে তিনি মত দেন।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিষ্ট নুসরাত নাহিদ বাবী
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিষ্ট নুসরাত নাহিদ বাবী বলেন, দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি সহজীকরণ ও আধুনিকায়ন করা হয়নি। বিশেষ করে স্থলবন্দরগুলোতে ডিজিটাল ব্যবস্থা না থাকায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসা ব্যয় বাড়ছে।
এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির
এডিবির সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, ধীরাশ্রম আইসিডি কনটেইনার ডিপো এবং একটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব প্রকল্প বাস্তবায়নে এডিবি কাজ করছে। একইসঙ্গে লজিস্টিক সেবার প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।



