ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তেল সরবরাহ সংকট: নিত্যপণ্যের দামে চাপ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই সংকটের প্রভাব এখন শুধু পেট্রোল বা ডিজেলের দামেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং খেলনা, পোশাক, জুতা এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন খরচেও পড়ছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাঁচামালের দাম বেড়ে যাচ্ছে, যা ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
পেট্রোকেমিক্যালের উপর নির্ভরশীল হাজারো পণ্য
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুসারে, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপন্ন পেট্রোকেমিক্যাল প্রায় ৬ হাজারেরও বেশি পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
- খেলনা ও কম্পিউটার কিবোর্ড
- লিপস্টিক, টেনিস র্যাকেট ও পায়জামা
- কন্টাক্ট লেন্স, ডিটারজেন্ট ও চুইংগাম
- জুতা, ক্রেয়ন ও শেভিং ক্রিম
- বালিশ, অ্যাসপিরিন ও মানুষের দাঁতের নকল পাটি
- টেপ, ছাতা এবং নাইলনের গিটার স্ট্রিং
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গার্নট ওয়াগনারের মতে, বিশ্বের তেলের মোট ব্যবহারের ৮৫ শতাংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, বাকি ১৫ শতাংশ ভোক্তা পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে কাজ করে। অপরিশোধিত তেল শোধন প্রক্রিয়ায় ইথিলিন, প্রোপিলিন, বিউটাইলিন, বেনজিন, টলুইন এবং জাইলিন নামক পেট্রোকেমিক্যাল তৈরি হয়, যা প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক ফাইবার তৈরির মূল ভিত্তি।
খেলনা ও পোশাক শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি
ফ্লোরিডাভিত্তিক খেলনা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যালেনি ব্র্যান্ডস-এর সিইও রিকার্ডো ভেনেগাস জানান, যুদ্ধের তিন সপ্তাহের মধ্যেই তাদের পলিয়েস্টার ও এক্রাইলিকের মতো কাঁচামাল সংগ্রহের খরচ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘খেলনার দাম যে তেলের দামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে, তা আগে কে ভেবেছিল?’ যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ২০২৭ সালের শুরু নাগাদ পণ্যের দাম বাড়াতে হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পোশাক ও জুতা শিল্পেও এই প্রভাব প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে। আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নেটি হারম্যান জানান, যুদ্ধের আগে পলিয়েস্টার টেক্সটাইলের দাম ছিল প্রতি কেজি ৯০ সেন্ট, যা এখন বেড়ে ১ ডলার ৩৩ সেন্টে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে প্রতিটি পোশাকে উৎপাদন খরচ ১০ থেকে ১৫ সেন্ট বাড়বে। ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ অব আমেরিকার (এফডিআরএ) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পেট্রোলিয়ামের দাম বাড়ায় ক্রেতাদের জন্য এক জোড়া জুতার দাম ১.৫ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা
অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও পরিস্থিতির চাপে পণ্যের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান জেন্টেল-এর সিইও ডেভিড নাভাজিও জানান, তাদের উৎপাদিত ব্যান্ডেজ ও ড্রেসিংয়ের মতো পণ্যে ব্যবহৃত আঠা পেট্রোকেমিক্যাল নির্ভর। উৎপাদন ও কাঁচামাল বাবদ খরচ ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা পণ্যের দাম ১৫ শতাংশ বাড়াতে যাচ্ছেন। ডেভিড নাভাজিও বলেন, ‘অতীতে আমি পরিবহন খরচ কমতে দেখেছি, কিন্তু কাঁচামালের দাম কমতে কখনও দেখিনি।’
শিল্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, যদি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৯০ ডলারের ওপরে থাকে, তবে সরবরাহ চেইন জুড়ে এই চাপের মাত্রা আরও বাড়বে। রিনসেরু-এর মতো প্রতিষ্ঠান, যারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম বিক্রি করে, তাদের পণ্য উৎপাদন খরচও ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ বিশ্বজুড়ে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির এই ঢেউ দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।



