ইরানে যুদ্ধের প্রভাবে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই, অর্থনীতিতে ধস
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে ইরানে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির শ্রম ও সমাজকল্যাণ উপমন্ত্রী গোলাম হোসেন মোহাম্মদী জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ব্যাপক ছাঁটাই।
বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়েছে প্রভাব
বিমান হামলার শিকার হয়ে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর বাইরেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যান্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, খুচরা বিক্রেতা, আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা এবং ডিজিটাল খাতও এর অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একজন লিখেছেন, ‘মেট্রোর জনশূন্যতা দেখলেই এটি বোঝা যায়।’ অন্য একজন বলেছেন, ‘অফিসের কাছে প্রচুর খালি পার্কিং জায়গা দেখে এটি বোঝা যাচ্ছে।’ তেহরানের হিম্মত মহাসড়কের ফাঁকা অবস্থার কথা উল্লেখ করে আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘দেড় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে আমার সময় লেগেছে মাত্র আধা ঘণ্টা।’
ইন্টারনেট শাটডাউনে অর্থনৈতিক ক্ষতি
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানি কর্তৃপক্ষের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ইন্টারনেট শাটডাউনের সিদ্ধান্ত দেশটির তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল খাতকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গত জানুয়ারিতে ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী সাত্তার হাশেমি বলেছিলেন, প্রতিদিন ইন্টারনেট বন্ধের কারণে অর্থনীতির অন্তত ৫০ ট্রিলিয়ন রিয়াল ক্ষতি হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫২ দিনের ইন্টারনেট শাটডাউনে ইরানি অর্থনীতির ১৮০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে।
নারীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
ইন্টারনেট শাটডাউন বিশেষ করে ক্ষতির শিকার হয়েছেন কর্মজীবী নারীরা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ইরানে কর্মক্ষম প্রতি নয়জন নারীর মধ্যে মাত্র একজন কর্মরত ছিলেন। পণ্য বিক্রির জন্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাখ লাখ নারী ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
শিল্পখাতে ব্যাপক ছাঁটাই
গত মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আসালুয়েহ ও মাহশাহরে অবস্থিত ইরানের বৃহত্তম দুটি পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট এবং সেই সঙ্গে দুটি বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মোবারকেহ স্টিল ও খুজেস্তান স্টিলে আঘাত হানে। সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন। আরও কয়েক লাখ মানুষ এমন সব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, যারা হয় এই মূল শিল্পগুলোয় পণ্য সরবরাহ করে অথবা কাঁচামালের জন্য এগুলোর ওপর নির্ভর করে।
সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন
দেশীয় সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা কিছু কারখানাকে বন্ধ হয়ে যেতে এবং তাদের শ্রমিকদের ছাঁটাই করতে বাধ্য করেছে। ইরানের মধ্যাঞ্চলের কোম প্রদেশের একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একজন নির্বাহী বলেছেন, কাঁচামালের অভাবে তারা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করছিলাম যুদ্ধ থামলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু আমরা জাহাজে মাল আনতে পারছি না। কারণ, আমাদের বিদেশি সরবরাহকারীরা চিন্তিত যে জাহাজটিকে ইরানি জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।’
সরকারি পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক চাপ
সরকার ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য একটি ঋণ প্রকল্প ঘোষণা করেছে, যেখানে প্রতি শ্রমিকের জন্য ৪৪০ মিলিয়ন রিয়াল ঋণ দেওয়া হবে। এই ঋণ ছয় মাসের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ শতাংশ হারে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। বিভিন্ন খাতে বেকারত্বের এই ঢেউ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সরকারি মুদ্রাস্ফীতির হার ৫০–এ ছাড়িয়ে গেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, আগামী মাসগুলোয় এই হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিণতি
যদি যুদ্ধ আবার শুরু হয় বা ইরান কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকে, তবে কোটি কোটি ইরানির জীবন আরও অনেক কঠিন হয়ে উঠতে পারে। শুধু বিমান হামলাগুলোই বিধ্বংসী পরিণতি বয়ে আনবে তা নয়, বরং অর্থনৈতিক মন্দা, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য এই সংকটকে উল্লেখযোগ্যভাবে আরও গভীর করে তুলতে পারে।



