অভিবাসন খাত বাজেটে উপেক্ষিত, সংকটে অর্থনীতি
অভিবাসন খাত বাজেটে উপেক্ষিত, সংকটে অর্থনীতি

দেশের অর্থনীতি এক কঠিন সময় পার করছে। বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলেছে। আওয়ামী সরকারের অনিয়ম, দুর্নীতি, বিতর্কিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, তোষণমূলক অর্থনীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে লুটপাট, আর্থিক খাতের ক্ষতের কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ভিত্তি ও প্রবৃদ্ধি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সুশাসনের ঘাটতির ফলে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়নি। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ গত ৩০ বছরে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাচ্ছে। বিনিয়োগ, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থানের গতি শ্লথ হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থমকে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে এবং স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। অর্থনীতির সব সূচক নিম্নমুখী হলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অভিবাসন খাত। আমাদের অর্থনীতির এক প্রাণশক্তি হয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে প্রবাসী আয়। আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা শুধু অর্থনীতির চালিকাশক্তি নন, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অপশক্তির বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জুলাই অভ্যুত্থানকালে রেমিট্যান্স প্রেরণ বন্ধ করে দেশের রাজনীতিতে সরাসরি অবস্থান নেন অভিবাসীরা। আওয়ামী সরকারের পতনের পর অভিবাসীরা আবারও রেমিট্যান্স পাঠানো শুরু করলে দেশের রিজার্ভ শক্তিশালী হয়। বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাজেটে অভিবাসন খাত উপেক্ষিত

এমন বাস্তবতায় খাত সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসা, আসন্ন বাজেটে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসন খাত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? এই খাত থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আসে, সে অনুযায়ী এই খাতের অংশটিতে বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয় কিনা? গবেষণায় দেখা যায় অভিবাসন খাতের বিকাশ, সক্ষমতা অর্জন, জনশক্তি প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নীতি সহায়তা, প্রবাসীসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের কল্যাণে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকে না। অর্থনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বাজেট বরাদ্দে এই খাত এখনো উপেক্ষিত। চলতি ২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ বিগত বছরগুলোর চেয়ে কমিয়ে মাত্র ৮৫৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ০.১১ শতাংশ। অথচ দেশের কর্মক্ষম জনশক্তির ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান অভিবাসনের মাধ্যমে। বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গতি ঊর্ধ্বমুখী রাখা না গেলে দরিদ্র লোকের সংখ্যা আরও ১০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের পরিকল্পনা

বর্তমান সরকার অভিবাসন খাতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষাজ্ঞান প্রদানের মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এর জন্য আসন্ন বাজেটে অভিবাসন খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা জরুরি। অর্থনীতির সোনার হরিণ এই অভিবাসন খাতে সরকারের তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই। এই খাত সংশ্লিষ্ট কিছু এজেন্সি পায় না সরকারি কোনো প্রণোদনা, ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কোনো জমি। অথচ দেশের ৯৫ শতাংশ কর্মী প্রেরণ করে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। তাই নীতিসহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কর্মী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে সক্ষমতা অর্জনের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। অভিবাসী ভাই-বোনদের সম্মানিত করতে রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল, সন্তানদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দূতাবাসগুলোতে সম্মাননা প্রদান, বিশেষ কর ছাড়, বিমানবন্দরে হয়রানিমুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও শ্রমবাজার

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা অভিবাসন খাতে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে বেশ অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৫০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। দেশের মোট রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। বিগত বছরের এই সময়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী যাওয়া ৪২ শতাংশ কমেছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান নয়—বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার সিঙ্গাপুরেও কর্মী যাওয়া কমেছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার মতো একটি বৃহৎ শ্রমবাজার এখনো বন্ধ রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি নেই জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শ্রমবাজারেও। কর্মী পাঠানোর সমঝোতা স্মারক সই হলেও অস্ট্রেলিয়া, গ্রিসের মতো দেশগুলোতে এখনো কর্মী প্রেরণ সম্ভব হয়নি। এছাড়া ইউরোপের শ্রমবাজার ধরতে বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশে তাদের দূতাবাস না থাকা। ইউরোপীয় দেশের ভিসা পেতে ভারতের নয়াদিল্লিতে দূতাবাসে যেতে হয় বাংলাদেশিদের।

অভিবাসন চ্যালেঞ্জ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় দিল্লি যেতে পারছেন না কর্মীরা। এক শ্রেণির দালাল চক্র চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় পাঠিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ায় নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে। লিবিয়াকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে মানব পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না। দালাল চক্রের এই ধরনের অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অন্যান্য সংস্থার সাথে একযোগে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণকারী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তির মাধ্যমে বড় এই শ্রমবাজারটি দ্রুত উন্মুক্ত করা জরুরি। তবে আশার কথা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জনকারী বিএনপি সরকারের উদ্যোগে গত ৯ এপ্রিল কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে শ্রমবাজারটি খোলার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। আশা করা যাচ্ছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি পুনরায় খুললে বিপুল সংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯৭৬ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ৬ হাজার ৮৭ জন কর্মী কুয়েতে প্রেরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের কর্মক্ষম বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে যেন দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করা যায়, তার জন্য গড়ে তুলেছিলেন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ লেবার সেন্ডিং কান্ট্রি হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো, পর্যটন, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স আহরণের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির শক্ত পোক্ত অবস্থান তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে রেমিট্যান্স। একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক কাঠামোকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। শুধু পরিবারের আয় বাড়ানো নয়, রেমিট্যান্স এখন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করছে, বাড়াচ্ছে বিনিয়োগ এবং গ্রামীণ বাজারকে করে তুলছে আরো সচল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ তৈরি করেছে। জাতীয় বাজেটের একটি বড় অর্থের জোগান আসে প্রবাসী আয় থেকে। অথচ সেই বাজেটেই গুরুত্ব নেই অভিবাসন খাতের। অর্থ বরাদ্দে সবচেয়ে পিছিয়ে এই খাত। বাজেটের আকার বাড়লেও বাড়ে না এ খাতের বরাদ্দ। মোট বাজেটের শূন্য দশমিক ৫ থেকে শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে এ খাতের বরাদ্দ। শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে গবেষণা এবং প্রশিক্ষণে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়োজন

দেশের অধিকাংশ কর্মীই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে প্রবাসে যাচ্ছেন। পৃথিবীতে এখন অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমে আসছে। সেজন্য আমাদের দক্ষ ম্যানপাওয়ার তৈরি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞান। আর এর জন্য দরকার বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ। বাজেটে অভিবাসন খাত গুরুত্ব পেলে বাড়বে প্রবাসী আয়, বাড়বে বৈদেশিক কর্মসংস্থান, বাড়বে রিজার্ভ, শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতি। তাই আসন্ন বাজেটে অভিবাসন খাতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদান এখন সময়ের দাবি।

লেখক: চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি