বিশ্বজুড়ে যখন জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে, তখন বিজ্ঞানীদের হাত ধরে উন্মোচিত হচ্ছে প্রকৃতির একের পর এক গোপন রহস্য। একদল অভিযাত্রী আফ্রিকার অ্যাঙ্গোলার পূর্বাঞ্চলে এক অভিযানের পর এমন কয়েক ডজন নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন, যা বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল।
লিসিমা মালভূমির রহস্য
অ্যাঙ্গোলার উচ্চভূমির প্রত্যন্ত লিসিমা মালভূমি কঙ্গো, ওকাভাঙ্গো, জাম্বেজি এবং কুয়ানজা নদীর পানির অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু অত্যন্ত দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং ২০০২ সালে শেষ হওয়া দীর্ঘ ২৭ বছরের বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধের কারণে এই জলাভূমি ও বনাঞ্চল এতদিন বিজ্ঞানীদের নাগালের বাইরে ছিল। এর আগে ২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকান অভিযাত্রী স্টিভ বয়েসের নেতৃত্বে এক অভিযানে এখানে এক বিশেষ প্রজাতির ‘ভূতুড়ে হাতি’-র ছবি ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছিল।
নতুন অভিযান ও আবিষ্কার
এবার গত ফেব্রুয়ারিতে বয়েসের প্রতিষ্ঠিত দ্য ওয়াইল্ডারনেস প্রজেক্ট-এর অধীনে কাসাই লাইফ অ্যাটলাস নামক নতুন এক সমীক্ষা চালানো হয়। ১৬ জন আফ্রিকান ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের এই দলটির অনুসন্ধানে বেশ কিছু চমকপ্রদ প্রাণীর খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো এক ধরণের কাঁকড়া মাকড়সা, যা অতিবেগুনি রশ্মির নিচে নীল রঙের আলো ছড়ায়। কেন এই মাকড়সা আলো ছড়ায়, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়।
এছাড়া সেখানে মিলেছে লেডিবির্ড অর্ব-ওয়েব স্পাইডার, যা শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে বিষাক্ত লেডিবির্ড পোকার রূপ ধারণ করে। অভিযানে ১০৩ প্রজাতির ফড়িংয়ের মধ্যে ৮টি এবং ৮টি নতুন মথের সন্ধান মিলেছে যা বিজ্ঞানের তালিকায় নেই। পাশাপাশি ৩টি নতুন ঘাসফড়িং ও ঝিঁঝিঁ পোকার প্রজাতিও নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
অজানা প্রাণীর সন্ধান
নতুন প্রজাতির পাশাপাশি বিজ্ঞানের জানা কিছু অসাধারণ প্রাণীও এখানে দেখা গেছে। যেমন, ৫ সেন্টিমিটার দীর্ঘ বিষদাঁতওয়ালা গ্যাবুন অ্যাডার সাপ, বাদুড়ের লোমের ভেতর ‘সাঁতার’ কেটে রক্ত চোষা ডানাছাড়া মাছি এবং পালকের মতো ডানাযুক্ত বিশেষ মথ।
প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সাফল্য
দলটির প্রধান রব টেইলর জানান, ভরা বর্ষার মৌসুমে কাজ করাটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কাদা মাটিতে পুরো দল সারাদিন আটকে থাকা থেকে শুরু করে গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়া এবং দলের কয়েকজন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার মতো নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে বিজ্ঞানীরা দমে না গিয়ে গাড়ি আটকে থাকার সময়টাকেই আশেপাশের জলাভূমিতে গবেষণার কাজে লাগিয়েছেন।
সংরক্ষণের উদ্যোগ
দুর্গমতার কারণে লিসিমা মালভূমিটি এতদিন মানুষের শোষণ থেকে রক্ষা পেলেও বর্তমানে খনি খনন, আগুন এবং জঙ্গল কাটার কারণে এই জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। দ্য ওয়াইল্ডারনেস প্রজেক্টের প্রচেষ্টায় ২০২৫ সালে এই মালভূমির ৫৪ লাখ হেক্টর এলাকাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং রামসার সাইট এটিকে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি ঘোষণা করেছে।
রব টেইলর বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু নতুন প্রজাতি নথিবদ্ধ করা নয়, বরং তারা যে পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল তা অক্ষুণ্ণ রাখা।
সূত্র: সিএনএন



