ইরানে হিজাব ছাড়া গান গাওয়ার অপরাধে এক নারী সংগীতশিল্পী ও তার প্রযোজনা দলের আট সদস্যকে ৭৪টি করে চাবুক মারার সাজা দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
সাজার বিবরণ
কোয়ম প্রদেশের ফৌজদারি আদালত পারাস্তু আহমাদি ও তার দলের সদস্যদের দোররা মারার পাশাপাশি দুই বছরের জন্য দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং দুই বছরের জন্য যেকোনো শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে 'অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট' তৈরি ও প্রকাশের মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা ও শালীনতা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, ২৯ বছর বয়সি আহমাদি হিজাব ছাড়া একটি লাইভ কনসার্টে 'আজ খুনে জাভানানে ভাতান' (স্বদেশের যুবকদের রক্ত থেকে) শিরোনামের দেশাত্মবোধক গান গেয়েছিলেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায় এবং লাখ লাখ বার দেখা হয়। এরপর তাকে ও সহশিল্পীদের কিছুদিন আটক রাখা হয়েছিল, পরে মুক্তি দিলেও কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করে।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক 'সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান'-এর অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর বাহার ঘান্দেহারি বলেন, 'শুধুমাত্র গান গাওয়া এবং হিজাব ছাড়া উপস্থিত হওয়ার জন্য ৭৪টি দোররা মারার শাস্তি একটি নির্মম অনুস্মারক। এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে ভাবমূর্তি উন্নত করার প্রচারণা সত্ত্বেও ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।'
ইরানি অ্যাক্টিভিস্টদের আইনি পরামর্শদাতা সংস্থা 'দাদবান'-এর আইনজীবী মইন খাজায়েলি বলেন, এই রায়ের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের ফৌজদারি আইনে নারীদের গান গাওয়া বা সংগীত পরিবেশন করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়নি। ফলে এই কর্মকাণ্ডকে 'অশ্লীল কনটেন্ট' হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, দোররা মারার শাস্তি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন, কারণ এটি নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ হিসেবে বিবেচিত।
শিল্পী ও অভিনেতাদের প্রতিক্রিয়া
ইরানি-ব্রিটিশ অভিনেতা নাজানিন বোনিয়াদি বলেন, 'হিজাব ছাড়া গান গাওয়ার মতো সাধারণ কাজের জন্য দোররা মারার সাজা একটি কঠোর বার্তা। ওয়াশিংটনে ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা যাই হোক, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে।'
অভিনেতা সেতারেহ মালেকি, যিনি অস্কার-মনোনীত চলচ্চিত্র 'দ্য সিড অব দ্য স্যাক্রেড ফিগ'-এ অভিনয়ের পর নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন, বলেন, 'আহমাদির কনসার্টের ভিডিওটি আমার মধ্যে প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়েছে। একজন নারী হিসেবে বেঁচে থাকার, গান গাওয়ার এবং নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার অধিকার ছাড়তে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ইরানি নারীরা অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই কখনো বন্ধ করে না।'
সাংস্কৃতিক দমনের প্রসঙ্গ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায় ইরানের সাংস্কৃতিক দমন-পীড়ন আরও বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। যদিও সরকারি বিচার বিভাগীয় সংস্থা এখনো রায় প্রকাশ করেনি, অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া শিল্পীদের গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক ভিন্নমত দমনের একটি বিস্তৃত প্রচেষ্টার অংশ।



