গাজায় যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ: বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ ও ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েই চলেছে
গাজায় যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ: বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে

যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ: গাজায় মানবিক সংকট চরমে

গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার আট মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। দেইর আল-বালাহ শহরের ১৪ বছর বয়সী কারাম জানায়, তার স্বপ্ন ছিল ফুটবলার হওয়ার, কিন্তু যুদ্ধ তার জীবন কেড়ে নিয়েছে। সে সিএনএনকে বলে, 'যুদ্ধের আগের জীবন ছিল খুব সুন্দর। কিন্তু এখন আর কোনো জীবন নেই।'

বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহতা

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ১৯ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা প্রায় পুরো জনসংখ্যা। তাদের অনেককে একাধিকবার আশ্রয়স্থল বদলাতে হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও বহু মানুষ অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছে, যেখানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই। মে মাসের শেষ দিকে জাতিসংঘ সতর্ক করে বলে, এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসকারীদের ত্বকে র‍্যাশ এবং পরজীবী সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের বসবাসের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকায় এ ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

ইঁদুর ও কীটপতঙ্গের উপদ্রব

ইঁদুর, তেলাপোকা ও বেজির উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এগুলো সহজেই তাঁবুর কাপড় ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছে এবং ঘুমন্ত শিশু, এমনকি নবজাতকদেরও কামড়ে দিচ্ছে। গাজায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানসের (এমএপি) জরুরি কার্যক্রমের প্রধান সালি সালেহ বলেন, 'আমরা এমন অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁদের সন্তানদের ইঁদুর কামড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, আবারও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পানি ও স্যানিটেশন সংকট

গাজা সিটির পানি সরবরাহ কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র হুসনি নাদিম মোহান্না বলেন, শৌচাগারের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক বাসিন্দা বাধ্য হয়ে অস্থায়ী পায়খানার গর্ত খুঁড়ছেন। এর ফলে মাটি ও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ছে। ইঁদুরের উৎপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা ত্রাণসামগ্রীর প্যাকেটও কেটে ফেলছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অল্প যে চাল বা আটা মজুত ছিল, তা ফেলে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার খাবার বাঁচাতে তাঁবুর ছাদ থেকে খাবারের পাত্র ঝুলিয়ে রাখছেন।

ইসরায়েলের দখল ও হামাসের পুনর্গঠন

গত মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তিনি সেনাবাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে আরও বড় এলাকা দখলে নেওয়া হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে হামাস নিজেদের পুনর্গঠিত করেছে এবং অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

প্রাণহানির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় গাজায় অন্তত ১ হাজার ৫৯ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৪২৯ জন আহত হয়েছেন। সিএনএনের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত অক্টোবর থেকে গাজায় গড়ে প্রতিদিন একজন করে শিশু নিহত হয়েছে। জুন মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা করার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েল এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ব্যর্থতা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন তাদের সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন গাজার বাসিন্দারা মার্কিন-সমর্থিত সমঝোতাকে ব্যর্থ ও অকার্যকর বলে মনে করছেন। সালি সালেহ বলেন, 'যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় বোমা হামলা হতে পারে। এখানে প্রকৃত অর্থে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই।'