দক্ষিণ আফ্রিকার স্প্রিংসে স্বর্ণের খনি আবিষ্কার: অবৈধ খননে উন্মাদনা ও ঝুঁকি
দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক রাজধানী জোহানসবার্গের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত স্প্রিংস শহরের একটি বস্তিতে হঠাৎ করে স্বর্ণের খনি আবিষ্কারকে ঘিরে একধরনের উন্মাদনা শুরু হয়েছে। কয়েকদিন আগে স্থানীয় এক বাসিন্দা দাবি করেন, গবাদিপশুর চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত বাড়ির বাইরের একটি খোলা জায়গার মাটি খুঁড়তে গিয়ে স্বর্ণের কণা ও ছোট ছোট টুকরা পাওয়া যায়। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: সোনার খনি আবিষ্কার
স্বর্ণের খনি পাওয়া গেছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই অসংখ্য মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে কোদাল ও শাবল নিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করেন। শতবর্ষ আগে যেভাবে সোনা ঘিরে জোহানেসবার্গের উত্থান হয়েছিল, বর্তমান দৃশ্য অনেকটা সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মতো। স্প্রিংস একসময় স্বর্ণের খনি সমৃদ্ধ শহর ছিল। তবে খনিগুলো অত্যন্ত গভীর হয়ে যাওয়ায় কয়েক বছর আগে তা অলাভজনক হয়ে পড়ে এবং বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে শহরটির চারপাশে গড়ে উঠেছে বহু বসতি, যেখানে প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা বহু অভিবাসী বাস করেন।
কর্তৃপক্ষের সতর্কতা: অবৈধ খনন ও পরিবেশগত ঝুঁকি
দেশটির খনিজ সম্পদ বিভাগ স্প্রিংসের গুগুলেথু অনানুষ্ঠানিক বসতিতে চলমান খনন কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা সতর্ক করেছে, অনিয়ন্ত্রিত খনন পরিবেশের ক্ষতি করছে এবং মাটি ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ঘটনাস্থলে খননকারীদের কেউ কেউ বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা স্বর্ণ পেয়েছেন এবং তা কালোবাজারে বিক্রি করেছেন। স্বর্ণ আলাদা করতে পারদ ও সোডিয়াম সায়ানাইডের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য: অর্থনৈতিক সংকট ও বেঁচে থাকার লড়াই
এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা জানি এটি অবৈধ। সরকার যদি খনির অনুমতি দিত, তাহলে আমরা বৈধভাবে কাজ করে কর দিতাম।” দুই সন্তানের এই বাবা জানান, সংসার চালানো ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতেই তিনি এই ঝুঁকি নিচ্ছেন। আরেকজনের ভাষ্য, “এটাই আমাদের একমাত্র উপার্জনের পথ। এটি না হলে অনেকেই হয়তো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়তো।”
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম প্রায় ১০০ মার্কিন ডলার। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার মাসিক ন্যূনতম মজুরি প্রায় ৩৬৮ ডলার। এই আয়ের ব্যবধানই অনেককে ঝুঁকি নিতে প্রলুব্ধ করছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্কুল ছুটির পর বিকেল দুইটার দিকে শিশুদেরও খননস্থলে আসতে দেখা গেছে। তারা স্কুলের পোশাক বদলে এসে বাবা-মাকে সহায়তা করছে।
দীর্ঘদিনের সমস্যা: অবৈধ খনন ও সরকারি পদক্ষেপ
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবৈধ খনন দীর্ঘদিনের সমস্যা। অতীতে অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ঘোষণা দিয়েছেন, অবৈধ খনন ও অপরাধী চক্র দমনে পুলিশকে সহায়তায় সেনা মোতায়েন করা হবে। কর্তৃপক্ষের দাবি, তথাকথিত ‘জামা জামা’ নামে পরিচিত অবৈধ খনিশ্রমিকদের একটি অংশ সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িত। তবে স্প্রিংসে বর্তমান ঘটনার সঙ্গে এমন কোনো চক্র জড়িত থাকার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য ও অবৈধ খননের জটিল সম্পর্ককে ফুটিয়ে তুলছে। স্থানীয়রা জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিচ্ছেন, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ পরিবেশগত ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা তুলে ধরছে। ভবিষ্যতে এই সংকটের সমাধান খুঁজে পাওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
