হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীকে হুঁশিয়ারি ইরানের
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীকে হুঁশিয়ারি ইরানের

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা জাহাজগুলোকে উদ্ধারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকে ওই প্রণালি থেকে দূরে থাকার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে সোমবার এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মার্কিন বাহিনী যদি এই প্রণালিতে প্রবেশ করে তবে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারগুলোকে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে চলাচল করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

ইরানি বাহিনীর যৌথ কমান্ডের প্রধান আলী আবদুল্লাহি এক বিবৃতিতে বলেছেন, আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি যে কোনও বিদেশি সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে আগ্রাসী মার্কিন সেনাবাহিনী যদি হরমুজ প্রণালিতে আসার এবং প্রবেশের ইচ্ছা প্রকাশ করে, তবে তারা হামলার শিকার হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এর আগে গত রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, যেসব দেশের জাহাজ ওই প্রণালীতে আটকে রয়েছে তাদের অনুরোধে তিনি ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি অভিযান শুরু করছেন। ওই জাহাজগুলোকে তিনি ‘নিরপেক্ষ ও নির্দোষ দর্শক’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

কোন কোন দেশ ওয়াশিংটনের সহায়তা চেয়েছে তা নির্দিষ্ট করে না বললেও ট্রাম্প নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ইরান, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য আমরা এই দেশগুলোকে বলেছি যে আমরা তাদের জাহাজগুলোকে নিরাপদে এই অবরুদ্ধ জলপথ থেকে বের করে নিয়ে আসব, যাতে তারা অবাধে এবং দক্ষতার সঙ্গে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে।

ট্রাম্প আরও বলেন, এই জাহাজগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতে খাবার এবং বড় ক্রু সদস্যদের সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর উপায়ে জাহাজে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছুর ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেছিলেন যে, এই অভিযানে যেকোনও ধরনের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দুর্ভাগ্যবশত জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা এই প্রচেষ্টায় ১৫ হাজার সামরিক কর্মী, ১০০টিরও বেশি স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক বিমান এবং এর পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন দিয়ে সহায়তা করবে। সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই প্রতিরক্ষামূলক মিশনে আমাদের সমর্থন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমরা নৌ অবরোধও বজায় রাখছি।

এদিকে তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক রসুল সেরদার আতাস জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনও ধরনের হস্তক্ষেপকে গত ৭ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখবে ইরান।

আতাস বলেন, ইরানিরা বিষয়টি খুব স্পষ্ট করেছে। তারা বলছে যে তারা সামরিকভাবে এর প্রতিক্রিয়া ও জবাব দেবে। আর তেমনটি হলে তা হবে যুদ্ধবিরতির অবসান। ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা বলছেন যে যুদ্ধ অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। সেখানে এখন একটি নতুন শাসন বা নিয়ম চালু হয়েছে এবং ইরান যেকোনও উপায়ে এই জলপথের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।

ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) সোমবার জানিয়েছে যে, চলমান সামরিক অভিযানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র নিরাপত্তার হুমকি এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। সংস্থাটি নাবিকদের ওমানের জলসীমা হয়ে রুট পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।

এর আগে ইউকেএমটিও জানিয়েছিল যে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলের কাছে একটি ট্যাঙ্কার অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব ক্রু নিরাপদ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

ইরান গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে নিজের জাহাজ ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য পারস্য উপসাগর দিয়ে চলাচল কার্যত বন্ধ করে রেখেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের ৩ ডলার থেকে বেড়ে গড়ে ৪.৪৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে।

ট্রাম্প এর আগে অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তিনি প্রণালিতে পারস্পরিক অবরোধের বর্তমান পরিস্থিতিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। এমনকি তিনি দাবি করেছিলেন যে মার্কিন অবরোধ বোমাবর্ষণের চেয়েও বেশি কার্যকর। তবে ইরানের অবরোধ শিথিল করতে মার্কিন পদক্ষেপ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মাঝে বজায় থাকা আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতিকে বদলে দিতে পারে।

কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক মার্কিন নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেছেন, ট্রাম্পের সর্বশেষ এই পরিকল্পনা একটি বিপজ্জনক উত্তেজনার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ইরানের কাছে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ছোট ছোট নৌযান রয়েছে যা এই বিষয়টিকে অনেক বেশি কঠিন করে তুলতে পারে। আমি এমন কোনও সংঘাত দেখতে চাই না যেখানে কোনও মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আক্রান্ত হবে; কারণ তখন আমেরিকানদের প্রতিশোধ নেওয়া ছাড়া আর কোনও বিকল্প থাকবে না।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই উত্তেজনা এমন এক সময়ে এসেছে যখন যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইরান ১৪ দফার একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কর্মকর্তারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন।

বাঘাই সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তানের মাধ্যমে মার্কিন বার্তা পাওয়া গেছে। আমি এই মুহূর্তে উত্থাপিত বিষয়গুলোর বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা করব না কারণ এই বিষয়গুলো এখনও পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক দাবি’ করার অভ্যাসের কারণে এই প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা সহজ নয়।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমে আসা খবরগুলোকেও জল্পনা-কল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বাঘাই। তিনি বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা পারমাণবিক উপাদান নিয়ে যেসব কথা উঠেছে তা পুরোপুরি জল্পনা-কল্পনা। এই পর্যায়ে আমরা যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ করা ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে কথা বলছি না। ভবিষ্যতে আমরা কোন দিকে যাব, তা ভবিষ্যতেই নির্ধারিত হবে।

সূত্র: আল জাজিরা