আগের পর্বে আমরা দেখেছিলাম, লক্ষ লক্ষ বছর আগে একটি গ্রহাণুর আঘাতেই ডাইনোসর এবং আদিম পৃথিবীর বেশির ভাগ প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে কীভাবে নিশ্চিত হলেন? সত্যি বলতে, এটি এক রোমাঞ্চকর গল্প। তবে গল্পটি পুরোপুরি বুঝতে হলে ভূতাত্ত্বিক সময়রেখা সম্পর্কে আমাদের একটু ধারণা থাকতে হবে।
পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক সময়রেখা
বিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখেছেন, আজ থেকে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর জন্ম। তখন তরুণ সূর্যের চারদিকে ভেসে বেড়াত গ্যাস ও ধূলিকণা। সেখান থেকেই সৃষ্টি এই গ্রহের। পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময়কালকে বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রাণের ক্রমবিকাশ এবং ভূতাত্ত্বিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এই সময়রেখা সাজানো হয়েছে।
মোটা দাগে এটি দুটি মহাযুগে বিভক্ত। গ্রহের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে প্রায় ৫৪১ মিলিয়ন বছর আগপর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় ক্রিপ্টোজয়িক ইয়ন বা লুকানো জীবনের মহাযুগ। অনেকে একে প্রি-ক্যামব্রিয়ান টাইম নামেও ডাকেন। প্রথম প্রাণের আবির্ভাব থেকে শুরু করে পৃথিবীর ইতিহাসের প্রায় ৮৮ শতাংশ ঘটনার খোঁজ মিলবে এই অংশে। এই মহাযুগটি আবার তিনটি ছোট যুগে বিভক্ত—হেডিয়ান, আর্কিয়ান ও প্রোটেরোজোয়িক।
হেডিয়ান যুগ
প্রথম যুগটি পৃথিবীর একদম সূচনালগ্নকে নির্দেশ করে। তখন পৃথিবী মূলত গলিত লাভায় ঢাকা ছিল। বারবার আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও গ্রহাণুর আঘাত চলত। তাই ওই সময়টিকে নরকের সঙ্গে তুলনা করলেও বাড়িয়ে বলা হবে না। ওই সময়েই পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের সৃষ্টি হয়।
আর্কিয়ান যুগ
এরপর আসে আর্কিয়ান যুগ। তখন পরিবেশ ঠান্ডা হতে শুরু করে। গঠিত হয় ভূত্বক বা কঠিন শিলা। তৈরি হয় প্রাথমিক বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর। প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মিলিয়ন বছর আগে আদিম জলজ পরিবেশেই প্রাণের প্রথম স্পন্দনের আবির্ভাব ঘটে।
প্রোটেরোজোয়িক যুগ
অন্যদিকে প্রোটেরোজোয়িক যুগের অন্যতম বড় ঘটনা হলো গ্রেট অক্সিডাইজেশন বা অক্সিজেনের উদ্ভব। এ সময়ে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন জমতে শুরু করে। এ ছাড়া প্রথম বহুকোষী প্রাণী ও জটিল জীবের উদ্ভবও হয়েছিল এই সময়েই।
ফ্যানেরোজোয়িক ইয়ন: দৃশ্যমান প্রাণের মহাযুগ
পৃথিবীর দ্বিতীয় মহাযুগটির নাম ফ্যানেরোজোয়িক ইয়ন বা দৃশ্যমান প্রাণের মহাযুগ। ৫৪১ মিলিয়ন বছর আগে থেকে শুরু করে এটি এখনো চলমান। বিজ্ঞানীরা একে তিনটি আলাদা যুগে ভাগ করেছেন। প্রতিটি যুগ আবার দুই বা ততোধিক পর্বে বিভক্ত।
প্যালিওজোয়িক যুগ
এর প্রথম যুগের নাম প্যালিওজোয়িক। এই যুগের প্রাণীদের দেহেই সর্বপ্রথম শক্ত অংশ বা বহিরাবরণ দেখা যায়। এ ছাড়া উভচর প্রাণী, কীটপতঙ্গ, মাছ ও সরীসৃপের মতো প্রাণীর আবির্ভাব এই যুগেই ঘটে।
মেসোজোয়িক যুগ: সরীসৃপদের অভয়ারণ্য
এর পরের যুগের নাম মেসোজোয়িক যুগ। একে বলা যেতে পারে সরীসৃপদের অভয়ারণ্য। এই যুগটি ট্রায়াসিক, জুরাসিক ও ক্রিটেসিয়াস—এই তিন পর্বে বিভক্ত। মূলত ডাইনোসরদের কারণে এই সময়কালটি অনেকের কাছেই বেশ পরিচিত। প্রথম পর্বে ডাইনোসরদের আবির্ভাব, দ্বিতীয় পর্বে তাদের ক্রমবিকাশ ও রাজত্ব এবং শেষ পর্বে ঘটে বিলুপ্তি। সব মিলিয়ে পৃথিবীতে তাদের রাজত্ব ছিল প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন বছর।
সেনোজোয়িক যুগ: স্তন্যপায়ীদের যুগ
গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসররা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপর ক্রিটেসিয়াস পর্বের শেষ দিকেই প্রথম প্রাইমেটদের আগমন ঘটে। তবে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সার্বিক বিকাশ ঘটেছিল মূলত ফ্যানেরোজোয়িক মহাযুগের শেষ ভাগে, অর্থাৎ সেনোজোয়িক যুগে। এ কারণে একে এইজ অব ম্যামলস বা স্তন্যপায়ীদের যুগ বলা হয়। বিজ্ঞানীরা একে দুটি পর্বে ভাগ করেছেন—টারশিয়ারি ও কোয়ার্টারনারি। বর্তমান মানবসভ্যতার স্থান হলো কোয়ার্টারনারি পর্বের হলোসিন অধিযুগে।
কে-টি বাউন্ডারি: রহস্যময় স্তর
পৃথিবীর ইতিহাসে এতক্ষণের এই ঝটিকা সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো—ক্রিটেসিয়াস ও টারশিয়ারি পর্বের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া। কারণ, খননকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে এই দুটি পর্ব সম্পর্কে ভূতাত্ত্বিকেরা এক চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন।
১৯৭৭ সাল। ইতালির গুবিও নামে স্থানে ভূত্বকের গভীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন ভূতাত্ত্বিক ওয়াল্টার আলভারেজ। তা বিশ্লেষণ করে এই দুটি পর্বের মাঝে তিনি আরেকটি অজানা স্তরের সন্ধান পান। সেটি যেন ছিল দুটি যুগের এক সীমানাপ্রাচীর! অর্থাৎ, এই স্তরের ঠিক নিচে থাকা পাথর ও জীবাশ্মগুলো ক্রিটেসিয়াস পর্বের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এবং ওপরে থাকা উপাদানগুলো টারশিয়ারি পর্বের।
পরে এই স্তরের নামকরণ করা হয় কে-টি বাউন্ডারি। একে সি-টি বাউন্ডারি নাম রাখলে ইংরেজি বানানের Cretaceous-Tertiary সঙ্গে বেশি সংগতিপূর্ণ হতো। কিন্তু এই আদ্যক্ষর আগে অন্য একটি জায়গায় ব্যবহার করে ফেলায় তা আর সম্ভব হয়নি।
যা হোক, এই স্তরটি সাধারণত মাটির অনেক গভীরে থাকে। তবে কিছু কিছু স্থানে, যেমন পাহাড়ের গায়ে বা পাথুরে বস্তুর ওপর ধূসর বা কালো রঙের পাতলা মাটির আবরণ হিসেবে এটি সরাসরি দেখা যায়। ডেনমার্কের স্টিভন্স ক্লিন্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের হেল ক্রিক ফরমেশন এর বড় উদাহরণ।
রহস্যময় এই কে-টি বাউন্ডারি নিয়ে বিজ্ঞানী মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। ডাইনোসরদের রাতারাতি বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে এর সরাসরি সম্পর্ক থাকতে পারে, এমন সম্ভাবনা থেকেই এই আগ্রহ তৈরি হয়।
ইরিডিয়ামের প্রমাণ
স্তরটির আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েন ওয়াল্টার আলভারেজ। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ লুইস আলভারেজ (ওয়াল্টারের পিতা) এবং দুই রসায়নবিদ ফ্রাঙ্ক আসারো ও হেলেন মিশেল। তাঁদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল মেলে বছরখানেক পরেই। স্তরটির নমুনার পুঙ্খানুপুঙ্খ রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে তাঁরা তাতে প্রচুর পরিমাণ ইরিডিয়াম খুঁজে পান।
সারা বিশ্বের প্রায় শতাধিক স্থান থেকে পাওয়া নমুনায় এই ইরিডিয়ামের গড় ঘনত্ব ছিল প্রায় ০.০০১ থেকে ০.০২৫ পিপিএম। স্টিভন্স ক্লিন্টের মতো কিছু বিশেষ জায়গায় এই মান সর্বোচ্চ ০.০৩০ পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া যায়। অথচ পৃথিবীর ভূত্বকে ইরিডিয়ামের স্বাভাবিক মাত্রা এর ধারেকাছেও নেই—মাত্র ০.০০০১ পিপিএম!
সত্যি বলতে, এই ধাতু সোনার চেয়েও বিরল। পৃথিবীর সূচনালগ্নে এই ধাতুর বেশির ভাগই লোহার সঙ্গে মিশে পৃথিবীর কেন্দ্রে জমা হয়েছে। বিশ্বে প্রতিবছর যে ৩ থেকে ৭ টন ইরিডিয়াম উৎপাদন করা হয়, তা মূলত নিকেল ও তামা শোধনের সময় উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে কে-টি বাউন্ডারিতে এই ইরিডিয়ামের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ থেকে ১৬০ গুণ বেশি ছিল!
১৯৮০ সালে প্রকাশিত এক বিখ্যাত গবেষণাপত্রে আলভারেজের দল এই বিপুল পরিমাণ ইরিডিয়ামের রহস্য উন্মোচন করেন। সমাধান হিসেবে তাঁরা গ্রহাণুর কথা সামনে আনেন। এই মহাজাগতিক বস্তুগুলো মূলত ইরিডিয়ামের বিশাল ভান্ডার। সাধারণ গ্রহাণুতে ইরিডিয়ামের গড় ঘনত্ব থাকে প্রায় ০.৫০ পিপিএম। অন্যদিকে লোহাসমৃদ্ধ গ্রহাণুতে এই মান ২০ পিপিএমের বেশি হতে পারে।
এসব তথ্য-প্রমাণ থেকেই মূলত গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসরসহ তৎকালীন জীবজগতের বেশির ভাগ বিলুপ্ত হওয়ার তত্ত্বটি জোরালো ভিত্তি পায়। তবে তখনো একটি ধাঁধার উত্তর বিজ্ঞানীরা মেলাতে পারেননি। যদি অতিকায় কোনো গ্রহাণু সত্যিই পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে, তবে এর ফলে যে বিশাল ও গভীর গর্ত সৃষ্টি হওয়ার কথা, সেটি কোথায় গেল? সেটিকে তো মহাকাশ থেকেও দেখতে পাওয়ার কথা, তাই না?
আসলে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। লক্ষ লক্ষ বছরের প্রাকৃতিক পরিক্রমায় একটি বিশাল গর্তের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব কিছু নয়। এমনকি কেউ যদি সেই গর্তের ঠিক কেন্দ্রস্থলেও দাঁড়িয়ে থাকেন, তবু হয়তো তিনি বুঝতেই পারবেন না যে তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন!
চিক্সুলুব গর্তের আবিষ্কার
এবার একটা মজার তথ্য দেওয়া যাক। আলভারেজদের গবেষণাপত্র প্রকাশের দুই বছর আগেই মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের কাছে একটি গর্ত খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এটিই ছিল সেই চিক্সুলুব ইমপ্যাক্টর বা গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্ট গর্ত। মার্কিন গ্লেন পেনফিল্ড এবং মেক্সিকান আন্তোনিও ক্যামারগো-জ্যানোগুয়েড়া নামে দুই ভূ-পদার্থবিদ এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। তবে তাঁরা সচেতনভাবে এই আবিষ্কারটি করেননি।
১৯৭৮ সালে মেক্সিকোর রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেমেক্স-এর হয়ে কাজ করার সময় দুই বিজ্ঞানী এর খোঁজ পান। কোম্পানিতে তাঁদের মূল দায়িত্ব ছিল মেক্সিকো উপসাগরীয় এলাকার চৌম্বকীয় মানচিত্র তৈরি করা। তখনই আকস্মিকভাবে সমুদ্রের তলদেশে এক বিশালাকার বৃত্তাকার এলাকা তাঁদের নজরে আসে। সেটি যে একটি প্রাচীন গর্ত হতে পারে, তা তাঁরা সঙ্গে সঙ্গেই অনুমান করেছিলেন। কিন্তু তেল কোম্পানির চাকরির গোপনীয়তার শর্ত মানতে গিয়ে তখন আর এর অস্তিত্ব বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
পরে ১৯৯০ সাল নাগাদ আরেক ভূ-পদার্থবিদ অ্যালান হিল্ডেব্র্যান্ড ওই আবিষ্কারের সঙ্গে আলভারেজদের তত্ত্বের উল্লেখযোগ্য মিল খুঁজে পান। গর্তটির ভেতর থেকে সংগ্রহ করা নমুনার নানা বৈশিষ্ট্য, যেমন শক কোয়ার্টজ বা ইরিডিয়ামের আধিক্যও এই তত্ত্বের সপক্ষে শক্ত প্রমাণ দেয়। শক কোয়ার্টজ হলো বিশেষ ধরনের স্ফটিক, যার ভেতরে আণুবীক্ষণিক ফাটল বা দাগ দেখা যায়। কেবল পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষের মতো ঘটনায় সৃষ্ট প্রবল চাপেই এগুলো তৈরি হওয়া সম্ভব।
এভাবেই সমাধান হয় পৃথিবীর ইতিহাসের দ্বিতীয় ধ্বংসাত্মক গণবিলুপ্তিকে ঘিরে থাকা মূল রহস্যের। আজ থেকে প্রায় ২৫২ মিলিয়ন বছর আগে সংঘটিত হওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ পার্মিয়ান-ট্রায়াসিক গণবিলুপ্তি বা গ্রেট ডায়িং-এর গল্পটা না হয় অন্য কোনো এক দিনের জন্য তোলা থাক। গ্রেট ডায়িং-এর কারণে তৎকালীন পৃথিবীর প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ সামুদ্রিক ও ৭০ শতাংশ স্থলজ মেরুদণ্ডী প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল কীটপতঙ্গদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই গণবিলুপ্তির পর পৃথিবী পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরতে সময় নিয়েছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন বছর। এরপরেই উত্থান হয় ডাইনোসরদের।
চলবে…
ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে



