বিশ্বকাপ শুরুর ৮০ বছরের মাথায় এসে নিজের নামের সার্থকতা প্রমাণ করল ফিফা। বিশ্বকাপের সূচনা হয়েছিল লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপকে অংশীদার করে, কিন্তু ভেন্যু হিসেবে কখনো আফ্রিকা ভ্রমণের স্বাদ পায়নি বিশ্বকাপ। সেই শূন্যতা পূরণ করে ২০১০ বিশ্বকাপ, যা আফ্রিকা মহাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজনের পেছনের জটিলতা
২০১০ বিশ্বকাপের ভেন্যু হিসেবে আফ্রিকার নাম চূড়ান্ত হয় ভেন্যু রোটেশন পলিসির আওতায়। এককভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা, যৌথভাবে মিসর-মরক্কো এবং লিবিয়া-তিউনিসিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকাকে বেছে নেওয়া হয়, তবে এর পেছনে ছিল জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। ফিফা সভাপতি সেপ ব্ল্যাটারের বিরুদ্ধে ২০০৬ বিশ্বকাপ জার্মানিতে নেওয়ার পর ২০১০ বিশ্বকাপেও অর্থের বিনিময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজনের অভিযোগ ওঠে, যার জন্য ২০১৫ সালে তিনি শাস্তি পান।
দক্ষিণ আফ্রিকার আয়োজন
দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও আয়োজনে কোনো কমতি রাখেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। বিশ্বকাপের আগেই ভুভুজেলা বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। আফ্রিকান ঐতিহ্যের সঙ্গে ফুটবলের মেলবন্ধনে এক অসাধারণ আয়োজন উপহার দেয় দেশটি। শুরুতেই শাকিরার ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গান পুরো বিশ্বে আলোড়ন তোলে, যা আজও বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গান হিসেবে খ্যাত।
তিকিতাকার উত্থান
বিশ্বকাপে ভুভুজেলার পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ের উত্থান ঘটে—তিকিতাকা। ইয়োহান ক্রুইফের উত্তরসূরি পেপ গার্দিওলার হাত ধরে ক্লাব ফুটবলে চালু হওয়া এই কৌশল স্পেনের হাত ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পৌঁছে। টোটাল ফুটবলের পর প্রথমবারের মতো ছোট ছোট পাসে বল নিজেদের কাছে রেখে পুরো মাঠ নিজেদের অধীনে আনার কৌশল সফলভাবে প্রয়োগ করে স্পেন।
স্পেনের দল ও শুরুর হোঁচট
ভিসেন্তে দেল বস্কের অধীনে স্প্যানিশ দল ছিল প্রতিভায় ভরপুর—ডিফেন্সে রামোস, পিকে, পুয়োল; মাঝমাঠে জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেটস, জাবি আলোনসো; আর আক্রমণে ডেভিড ভিয়া ও ফার্নান্দো তোরেস। ফেবারিট হিসেবেই বিশ্বকাপে এসেছিল স্পেন, কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে হোঁচট খায়। সমালোচনা হয় অধিনায়ক ইকার ক্যাসিয়াসকে নিয়েও—গোলপোস্টের পেছনে প্রেমিকা সারা কারবোনেরার দিকে তাকিয়ে মনোযোগ হারানোর গুঞ্জন ওঠে। পরে সারাকে সরিয়ে নেওয়া হলে ক্যাসিয়াস ফিরে পান নিজের ছন্দ।
ইকার ক্যাসিয়াসের অসাধারণ পারফরম্যান্স
২০১০ বিশ্বকাপে একজন গোলরক্ষক কীভাবে পুরো টুর্নামেন্টের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন, তার প্রমাণ দেন ক্যাসিয়াস। শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচজয়ী সেভ, কোয়ার্টার ফাইনালে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি সেভ, আর সেমিতে জার্মানির বিপক্ষে টনি ক্রুসের দূরপাল্লার শট—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
ফাইনাল: নেদারল্যান্ডস বনাম স্পেন
অন্যদিকে ব্রাজিল ও উরুগুয়েকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে নেদারল্যান্ডস। টোটাল ফুটবলের জনক এবার মুখোমুখি তিকিতাকার। ফুটবল বদলে দেওয়া দুই কৌশলের লড়াইয়ে জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে ফাইনালে দেখা মেলে ডাচদের ফিজিক্যাল ফুটবলের। দুইবার ফাইনাল হেরে ডাচরা বুঝে গিয়েছিল, সুন্দর ফুটবলের চেয়ে বিশ্বকাপ জেতা বেশি জরুরি। রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েবকে ১৪ বার হলুদ কার্ড বের করতে হয়েছিল সেদিন। বারবার আক্রমণ করেও ফল পায়নি নেদারল্যান্ডস।
কারণ একটাই—ইকার ক্যাসিয়াস। রোবেন, স্নাইডার, ভ্যান পার্সিদের একের পর এক শট তিনি একাই থামিয়ে দেন। বিশেষ করে ৬৬ মিনিটে রোবেনের থামিয়ে দেওয়া সেভ বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেভ হিসেবে বিবেচিত। আর নেদারল্যান্ডসের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ১১০ মিনিটে করা সেই গোল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ এনে দেয় স্পেনের হাতে। অধিনায়ক ক্যাসিয়াসের হাতে ওঠে ট্রফি। ১২ বছর পর নতুন বিশ্বজয়ীর দেখা পায় ফুটবল বিশ্ব।



