ইউরোপে অপরাধ হ্রাসে কারাগার বন্ধ, গির্জা হচ্ছে পাব
ইউরোপে অপরাধ কমায় বন্ধ হচ্ছে কারাগার, গির্জা পাব

ইউরোপের নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ নাউরু এবং নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার জাপানে অপরাধের সংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে বড় বড় কারাগারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাষ্ট্রের খরচ সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এসব দেশের কারাগারগুলো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো জাদুঘর, বাসস্থান, রেস্টুরেন্ট কিংবা পাবে পরিণত করা হয়েছে। প্রয়োজন মতো ছোটখাটো দু-একটা কারাগার তৈরি করা হয়েছে। ভ্যাটিকান সিটি ও নাউরুতে কোনো কারাগার নেই।

অপরদিকে একই দৃশ্য দেখা যায় ধর্মীয় উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, যেমন যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, নরওয়েসহ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র এবং নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মানুষের মধ্যে ধর্মের প্রতি আগ্রহ ক্রমাগত কমে আসছে। ফলে বড় বড় চার্চগুলোতে ভক্তের সংখ্যা মারাত্মক রকমে কমে আসছে। রবিবার সামান্য কিছু বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে চার্চে যেতে দেখা যায়। যুবসমাজ চার্চ বা ধর্ম থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। এতে বড় বড় চার্চগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারের বিশাল অর্থ খরচ আজ অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। ফলে শত শত গির্জা বন্ধ করে সেগুলো রেস্টুরেন্ট, পাব ও ক্লাবে পরিণত করছে।

অথচ আমাদের দেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেই অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কারাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বহর। ফলে সরকারের কোষাগারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে এসব দেশে ধর্মবিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উপাসনালয়ের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—ধর্মের বিস্তারের সঙ্গে অপরাধ বিস্তারের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আধুনিক তুরস্কের জনক জিয়া গোকালপ ১৯১৩ সালে। তিনি লিখেছেন, ‘একসময় ধর্মকে ভিত্তি করে আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখন সে জায়গায় বিজ্ঞান-নির্ভর আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।’ ১৯১৩ সালের পর ১১৩ বছর পার হয়ে গেছে। তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণী বেদবাক্যের মতো সত্যে পরিণত হয়েছে। যেসব দেশ আজও বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা গড়ে তুলতে এগোয়নি, আজকের বিশ্বে তাদের অবস্থান কোথায়, তা কাউকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় না। মুসলিম বিশ্ব খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সবার পেছনে চলেছে, এ কথা খোদ তুরস্কের জন্যও সত্যি। ১৯৩৮ সালে মোস্তফা কামাল পাশার মৃত্যুর পর তুরস্ক ক্রমান্বয়ে সে পথ ও বিপ্লব থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

একমাত্র মুসলিম বিজ্ঞানী, যিনি ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জয় করেছিলেন, তিনিও বারবার বলেছেন—‘অব দ্য মেজর সিভিলাইজেশন অন দিস প্ল্যানেট, সায়েন্স ইজ দ্য উইকেস্ট ইন দ্য ইসলামিক কমনওয়েলথ।’ তিনি বলেন, ১১০০ সালে ইসলামে সৃজনশীল বিজ্ঞানের পতন শুরু হয়, মাত্র আড়াইশত বছরে তা সমাপ্ত হয়।

রোকেয়া খাতুনের বিখ্যাত উক্তিটিও উল্লেখ করা যায়। ১৯২৩ সালে তিনি একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘যেখানেই ধর্মবন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। আর যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল, সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের মতো উন্নত অবস্থায় আছেন।’

তাহলে কি ধর্ম ও অপরাধ হাত ধরাধরি করে চলে? উত্তরে বলতেই হয় ‘না’। জিয়া গোকালপ চেয়েছিলেন ধর্মের সঙ্গে ইহজাগতিকতার মিশ্রণ চলবে না। ধর্ম থাকবে ধর্মের জায়গায়, আর ইহজাগতিকতা বা রাজনীতি থাকবে তার জায়গায়। এই দুটোকে একত্র করতে গেলে উভয়েরই ক্ষতি। আজ তাঁর কথাই সত্যে পরিণত হয়েছে। ধর্ম আজ ধর্মচ্যুত হয়েছে এবং রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ফলিত রসায়ন ও রাসায়নিক প্রযুক্তি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়