রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চরকান্দিনা, হরিচরণ, সাতঘড়ি ও ডারারপাড় গ্রামে এখন টুপিতে নকশা তোলার কাজে ব্যস্ত নারীরা। রাস্তার ধারে, বাড়ির সামনে ও উঠানে তাঁদের জটলা। সবার হাতে সুই-সুতা আর রংবেরঙের কাপড়। গল্প করতে করতে সুই দিয়ে কাপড়ে চলছে হাতের কাজ। যেকোনো বাড়ির ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, কেউ রান্না করছেন, সঙ্গে চলছে টুপিতে নকশা তোলা। উঠানে গল্প করতে করতে চলছে হাতের কাজ। সুইয়ের ফোঁড়ে নান্দনিক নকশায় ফুটে উঠছে প্রতিটি টুপি। বিশেষ কায়দায় সেলাই ও ভাঁজ করে ওই কাপড় দিয়ে বানানো হচ্ছে টুপি।
দারিদ্র্য জয় করে সাফল্য
ওই সব গ্রামের প্রায় এক হাজার নারী টুপিতে নকশার কাজ করে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন। তাঁদের নকশা করা টুপি যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। দেশে আসছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। হরিচরণ গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গ্রামটির কয়েকজন মানুষ চট্টগ্রাম থেকে ফিরে বাড়ির নারীদের হাতে তুলে দেন সঙ্গে আনা নানা উপহার। এ সময় কিছু টুপিও উপহার দেওয়া হয় তাঁদের। বলা হয়, 'দেখো তো পারো কি না এমন করে টুপি বানাতে।' ওই নারীরা তখন নকশার কাজ জানতেন না, নকশা করার টুপি বানাবে কী করে? তাই বলে উৎসাহের কমতি ছিল না কারও। নকশার কাজ জানে এমন কারও খোঁজ করতে লাগলেন তাঁরা। জানা গেল, পাশের পেটভাতাগ্রামের সাবিনা বেগম নকশার কাজ জানেন। তাঁর কাছে গিয়ে ধরনা দিলেন তাঁরা। হরিচরণ গ্রামে এসে কয়েকজন নারীকে টুপিতে নকশা তোলার কাজ শেখালেন সাবিনা। সেই থেকে হরিচরণসহ আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে টুপি তৈরির কাজ। এখন গ্রামের নারীরা টুপিতে নকশার কাজ করে মাসে ৮-৯ হাজার টাকা আয় করছেন।
নারীদের জীবন বদলে দিয়েছে টুপি
হরিচরণ গ্রামের সাহিনা বেওয়ার জমি ছিল না। ১০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনোরকমে তিন সদস্যের সংসার চালাতেন তিনি। এখন তাঁর বাড়িতে হাঁস-মুরগি–গাভি আছে। ৩০ শতক জমি বন্ধক নিয়েছেন। টুপিতে নকশার কাজ করে তিনি মাসে ৯ হাজার টাকা আয় করছেন। ওই গ্রামের স্বামীহারা সুলতানা খাতুনও টুপিতে নকশার কাজ করে সংসারের সচ্ছলতা এনেছেন। খেতে পারছেন তিন বেলা। তাঁর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আরেক মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। দুটি গাভি ও চারটি ছাগল আছে। ওই গ্রামের রশিদা বেগমের স্বামী এরশাদুল হক চার বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় কর্মক্ষমতা হারান। নকশার কাজ করে রশিদা এখন সংসার চালান। একইভাবে নানকর গ্রামের সিদ্দিকা বেগম মুরাদপুর গ্রামের মঞ্জিলা খাতুন, সোলেমা খাতুন, আশরাফি খাতুন টুপিতে নকশার কাজ করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। সন্তানদের লেখাপড়া করানোসহ খেতে দিতে পারছেন তিন বেলা।
শিক্ষার্থীরাও আয় করছে
সাতঘড়ি গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী ময়না খাতুন বলে, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে সে টুপিতে নকশা করে, এতে সাত–আট হাজার টাকা উপার্জন হয়। নিজের আয়ে পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছে এবং বাবার সংসারে সহায়তা করছে সে। ডারারপার গ্রামের মিম খাতুন বলেন, 'এলা মোক বাসাবাড়ির কাজেরে খোঁজত বাইরোত যাবার নাগে না। প্রত্যেক দিন মোর টুপি সেলাই করি তিন শ টাকা কামাই হয়ছে। টুপি মোক নতুন জীবন দিছে।'
আর্থিক স্বাবলম্বিতা
চরকান্দিনা গ্রামের জহরা আক্তার বলেন, ভিটামাটি ছাড়া কিছুই ছিল না। এখন টিনের ঘর ও নিজের ৩৮ শতাংশ জমি আছে। গাছগাছালিঘেরা বাড়িতে হাঁস-মুরগি, ছাগল ও গাভি পালন করছেন। টুপিতে নকশার কাজ করে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। সন্তানেরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। সংসারের সবাই এখন জহরার মতামতকে গুরুত্ব দেন। ওই গ্রামের আরজিনা বেগম রান্নাঘরের কাজের ফাঁকে ফাঁকে টুপির কাজ করছেন। তিনি বললেন, সংসারের অন্য কাজের সঙ্গেই এ কাজ করা যায়। সংসারের সব কাজ সেরেও শুধু টুপিতে নকশার কাজ করে মাসে আট হাজার টাকা আয় হয়।
কাজের প্রক্রিয়া ও মজুরি
টুপিতে নকশা তোলার কারিগর সাতঘড়ি পাড়া গ্রামের রাহেনা খাতুন বলেন, সাদা কাপড়কে কেটে টুপি তৈরির উপযুক্ত করা হয়। কাটিং কারিগর প্রতি টুপিতে ১০ টাকা মজুরি পান। কাটার পর এর মধ্যে নকশা করতে হয়। এরপর মেশিনে সেলাই করা হয়। প্রতিটি টুপি সেলাইয়ের জন্য শ্রমিকেরা পান ৬০ টাকা। হাসুর কাজের জন্য দেওয়া হয় ৩০ টাকা। নারীরা সুই-সুতা দিয়ে নকশা করার জন্য টুপিপ্রতি পারিশ্রমিক পান ৪৫০-৫৫০ টাকা। নকশা করার সুই-সুতা সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। ওই গ্রামের আরেক কারিগর লাকি বেগম বলেন, টুপির দুটি অংশ থাকে। নকশা তোলার পর তা মহাজনের কাছে পাঠানো হয়। সাধারণত টুপির ওপর ও নিচের দুটি অংশে বিভিন্ন রঙের রেশমি সুতা দিয়ে প্রচুর কারুকাজ করা হয়। কাজ শেষ হলে গ্রামের নারীদের মজুরি পরিশোধ করে টুপিগুলো নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। নতুন কাজের জন্য দিয়ে যান কাপড় ও সুই-সুতা। নকশাভেদে এসব টুপি হয় দুই রকম। হাফ দানা ও ফুল দানা। একটি হাফ দানা টুপির নকশার মজুরি ৫৫০ টাকা, আর ফুল দানার মজুরি ৪৫০ টাকা।
রপ্তানি ও প্রশংসা
ঢাকার টুপি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, 'ইটাকুমারী ইউনিয়নের চার গ্রামের নারীদের নকশা করা টুপি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাঠাই। কাপড়ভেদে সেখানে প্রতিটি টুপি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়।' ইটাকুমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য ইসমাইল হোসেন বলেন, আগে এ গ্রামের নারীরা শ্বশুরবাড়িতে নানা নির্যাতনের শিকার হতেন। এখন রোজগার করায় শ্বশুরবাড়ির সবার ভালোবাসা পাচ্ছেন। টুপিতে নকশার কাজ করে এসব গ্রামের নারীরা বাড়তি আয় করছেন। পীরগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এনামুল হক আজ শনিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, 'ওই সব গ্রামের নারীরা টুপিতে নকশার কাজ করে তাঁদের ভাগ্যের বদল করেছেন। আমি তাঁদের নকশার কাজ সচক্ষে দেখেছি।'



