যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯৬ সালে কিউবা ও ফ্লোরিডার মাঝামাঝি আকাশসীমায় দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় কিউবার সাবেক নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ গঠন করেছে। প্রায় তিন দশক পর আনা এই মামলাকে কেন্দ্র করে দুদেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগপত্রে যা আছে
বুধবার (২০ মে) প্রকাশিত অভিযোগপত্রে রাউল কাস্ত্রোসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে চারজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন ছিলেন মার্কিন নাগরিক। একইসঙ্গে কিউবান-আমেরিকান সংগঠন ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’-এর মালিকানাধীন দুটি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার অভিযোগও রয়েছে। ঘটনার সময় রাউল কাস্ত্রো কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন। বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৯৫ বছর।
মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য
মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ জানান, কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিমান ধ্বংস ও চারজনের মৃত্যুর ঘটনায় পৃথক হত্যার অভিযোগ আনা হবে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। ব্ল্যাঞ্চ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের নাগরিকদের কখনো ভুলে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও ভুলবে না।’
কিউবার প্রতিক্রিয়া
তবে কিউবা এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল অভিযোগগুলোকে ‘আইনি ভিত্তিহীন রাজনৈতিক চাল’ হিসেবে আখ্যা দেন। তার দাবি, কিউবা নিজেদের জলসীমায় বৈধ আত্মরক্ষার অংশ হিসেবেই ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল। একইসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিউবার ওপর চাপ বাড়ানোর অভিযোগও তোলেন। কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মামলা এনে ‘সামরিক আগ্রাসনকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা’ করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মত
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার কমিউনিস্ট শাসনের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবেই এই মামলা সামনে আনা হয়েছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম লিওগ্রান্ড বলেন, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হচ্ছে চাপ বাড়িয়ে কিউবাকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকারে বাধ্য করা।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও তেল অবরোধের কারণে কিউবায় বিদ্যুৎ সংকট ও খাদ্য ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার জনগণের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় ‘নতুন সম্পর্কের পথ’ তৈরির আহ্বান জানান। তিনি কিউবার সামরিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী জিএইএসএ-কে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী করেন। তবে কিউবার সরকার পাল্টা অভিযোগ করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে দেশটির জনগণের ওপর ‘যৌথ শাস্তি’ চাপিয়ে দিচ্ছে।
গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ভবিষ্যৎ
এদিকে রাউল কাস্ত্রোকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি টড ব্ল্যাঞ্চ। তবে তিনি জানান, কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে তিনি ‘স্বেচ্ছায় বা অন্য কোনো উপায়ে’ আদালতে হাজির হবেন। মিয়ামিতে কিউবান নির্বাসিতদের মধ্যে এই মামলাকে ঘিরে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। ১৯৯৬ সালের ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সদস্যরা এটিকে ‘বিচারের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সম্ভাব্য প্রভাব
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই মামলা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কিউবা ইতোমধ্যে ‘কোনো আত্মসমর্পণ নয়’ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে।



