ভারতের মুম্বাইয়ে একই পরিবারের চার সদস্যের রহস্যজনক মৃত্যুর প্রায় তিন সপ্তাহ পরও তদন্তকারীরা নিশ্চিত হতে পারছেন না, ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন রাতে। গত ২৫ এপ্রিল মুম্বাইয়ের পাইধোনি এলাকার বাসা থেকে আবদুল্লাহ ডোকাদিয়া, তাঁর স্ত্রী নাসরিন এবং দুই মেয়ে আয়েশা ও জয়নাবকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর একে একে চারজনেরই মৃত্যু হয়।
ঘটনার পটভূমি ও 'তরমুজ মৃত্যু' নামকরণ
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই ভারতীয় গণমাধ্যমে এটি পরিচিতি পায় ‘ওয়াটারমেলন ডেথস’ বা ‘তরমুজ মৃত্যু’ নামে। কারণ, মৃত্যুর আগে পরিবারের সদস্যরা শেষ যে খাবারটি খেয়েছিলেন, সেটি ছিল তরমুজ। এরপর ভারতজুড়ে শুরু হয় জল্পনা। অনেক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, তরমুজে ভেজাল ছিল কিংবা এতে বিষ মেশানো হয়েছিল। বলা হচ্ছিল, গভীর রাতে ওই ফল খাওয়ার পরই দম্পতি ও তাঁদের কিশোরী দুই মেয়ে মারা যান। এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মুম্বাইয়ের বাজারে তরমুজের চাহিদা কমে যায়, দামও পড়ে যায় হঠাৎ করে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠতে থাকে, এটি কি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
ফরেনসিক পরীক্ষায় জিঙ্ক ফসফাইড শনাক্ত
গত সপ্তাহে মুম্বাই পুলিশ জানায়, ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ডোকাদিয়া পরিবারের মৃত্যুর কারণ ছিল জিঙ্ক ফসফাইড; যা ইঁদুর মারতে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত একটি রাসায়নিক। মৃতদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং তরমুজের অবশিষ্টাংশে এই রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এই তথ্য প্রকাশের পরও রহস্যের জট খোলেনি। বরং প্রশ্ন আরও বেড়েছে।
বুধবার মুম্বাই পুলিশের একাধিক সূত্র বিবিসিকে জানায়, এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি কেন কিংবা কীভাবে ওই বিষ তরমুজে গেল। একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এখনো প্রমাণ সংগ্রহ করছি এবং সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখছি। হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা কিংবা আত্মহত্যা; কোনো আশঙ্কাই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।’
পরিবারের শেষ রাতের বিবরণ
দক্ষিণ মুম্বাইয়ের পুরোনো এক ভবনের প্রথম তলায় থাকত ডোকাদিয়া পরিবার। ঘটনার পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ জানায়, সেদিন রাতে তারা কয়েকজন আত্মীয়কে রাতের খাবারে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে বিরিয়ানি পরিবেশন করা হয়েছিল। রাত সাড়ে ১০টার দিকে অতিথিরা চলে যান। কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারের সদস্যরা তরমুজ খান। এরপরই তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট উপকমিশনার প্রবীণ মুন্ধে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তাদের সবার বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয়। প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে জেজে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে চারজনই মারা যান।’
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেশীদের বক্তব্য
পরিবারটির বিপদের খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একই ভবনের চতুর্থ তলার বাসিন্দা চিকিৎসক জায়েদ কোরেশি। বিবিসি মারাঠিকে তিনি বলেন, ‘চারজনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট মেয়েটির শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি তাকে সিপিআর দিই। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে কাছের হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সে মারা যায়।’ তিনি আরও বলেন, বাকি তিনজনকে স্থানীয় হাসপাতাল থেকে জেজে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তাঁরাও পরে মারা যান। এখনো তাঁদের ময়নাতদন্তের পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
জিঙ্ক ফসফাইডের প্রভাব ও তদন্তের বর্তমান অবস্থা
ঘটনার পর পুলিশ তরমুজের খোসাসহ সব খাবারের নমুনা জব্দ করে। কারণ, অসুস্থ হওয়ার আগে শেষবার পরিবারটি সেগুলো খেয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে মুম্বাই ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির (এফএসএল) প্রতিবেদনের পর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে জিঙ্ক ফসফাইড।
এফএসএলের পরিচালক বিজয় ঠাকারে বিবিসি মারাঠিকে বলেন, ‘মৃত ব্যক্তিদের ভিসেরা নমুনা, বিশেষ করে যকৃত, কিডনি ও প্লীহা এবং পাকস্থলীর উপাদান, পিত্ত ও পেটের চর্বির নমুনায় জিঙ্ক ফসফাইড পাওয়া গেছে। তরমুজের নমুনাতেও এই রাসায়নিক শনাক্ত হয়েছে।’ তদন্ত কর্মকর্তা প্রবীণ মুন্ধেও নিশ্চিত করেন, ‘তদন্তের সময় সংগ্রহ করা তরমুজের নমুনায় রাসায়নিকটি পাওয়া গেছে। তবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো অন্য কোনো খাবারে এটি পাওয়া যায়নি।’
ইঁদুরের বিষ ও সম্ভাব্য উৎস
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোকাদিয়ারা যে ভবনে থাকতেন, সেখানে ইঁদুরের উপদ্রব ছিল। অনেক পরিবারই ইঁদুর তাড়াতে রিপেলেন্ট, বিষযুক্ত কেক ও গ্লু প্যাড ব্যবহার করত। ইঁদুর মারতে ব্যবহৃত কিছু বিষে জিঙ্ক ফসফাইড থাকে। মুম্বাইভিত্তিক চিকিৎসক ভূষণ রোকাড়ের ভাষায়, এটি ‘অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ’।
তিনি বলেন, ‘এটি শরীরে প্রবেশ করলে বা আর্দ্রতার সংস্পর্শে এলে ফসফিন গ্যাস তৈরি হয়। এতে শরীরের কোষ অক্সিজেন ব্যবহার করতে পারে না এবং একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মারাত্মক প্রভাব পড়ে।’ তাঁর মতে, এই বিষক্রিয়ার উপসর্গের মধ্যে রয়েছে বমি, বুক চেপে আসা, শ্বাসকষ্ট ও শকে চলে যাওয়া। ‘অতি অল্প পরিমাণেও এটি প্রাণঘাতী হতে পারে,’ বলেন তিনি।
তদন্তের চলমান প্রচেষ্টা
বুধবার বিবিসিকে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কীভাবে ইঁদুরের বিষ তরমুজে গেল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় ধাঁধা। তিনি বলেন, ‘আমরা আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, প্রতিবেশী ও কর্মস্থলের সহকর্মীসহ ৪০ থেকে ৫০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তদন্তে একাধিক দল কাজ করছে।’ তাঁর কথায়, ‘উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমরা তদন্ত চালিয়ে যাব।’



