ভেনিজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানি দেড় শতাধিক মানুষের। আহত হয়েছে প্রায় ১ হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু ভবন, জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। বৈশ্বিক এমন বিপর্যয়ের মধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও একাধিকবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে—ঘনঘন ভূমিকম্পের কারণ কী, আর বড় ধরনের ভূমিকম্পের মুখোমুখি হলে মোকাবেলা করতে বাংলাদেশ আসলে কতটা প্রস্তুত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি কেবল ভূমিকম্পের কারণে নয়; দুর্বল নির্মাণব্যবস্থা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের ঘাটতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল তদারকি ব্যবস্থাও ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এড়ানো সম্ভব না হলেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।
এক মাসেই দেশে ভূমিকম্প হয়েছে চারবার
বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর ভূত্বক কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটের সমন্বয়ে গঠিত। এসব প্লেটের চলাচলের ফলে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমতে থাকে। এই টেকটোনিক প্লেটের আকস্মিক নড়াচড়া, ঘর্ষণ এবং ফাটল বা চ্যুতিতলে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হওয়ার কারণে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। ফলে ভূমিকম্প মূলত পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল।
সম্প্রতি দেশে একের পর এক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২২ জুন রাত ৯টা ২৮ মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪ দশমিক শূন্য মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আগারগাঁও সিসমিক সেন্টার থেকে ১৬ কিলোমিটার পূর্বে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে।
এর আগে ১৮ জুন রাত ৯টা ২৯ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার, ১১ জুন রাত ৯টা ৪০ মিনিটে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার এবং ৭ জুন রাত ১১টা ৩৭ মিনিটে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ফলে জুন মাসেই পরপর চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় দেশের ভূমিকম্প-প্রস্তুতি ও অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়ে যা বলছে বিশেষজ্ঞরা
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ভূমিকম্প-প্রস্তুতি অত্যন্ত দুর্বল। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বারবার ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি অনুভব করছি, কিন্তু তারপরও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি কতটা দুর্বল, তার একটি বড় উদাহরণ হলো—নগর এলাকার বাইরে কেউ ভবন নির্মাণ করলে সেই ভবনের মান যাচাই ও তদারকির জন্য কার্যকর কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। বাংলাদেশের বিল্ডিং কোডে বলা আছে যে একটি বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি থাকবে, যারা নির্মাণের গুণগত মান যাচাই করবে। কিন্তু এত বছরেও আমরা সেই কর্তৃপক্ষ গঠন করতে পারিনি।’
দীর্ঘদিন ধরে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা ও নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ভবনের বাহ্যিক নকশা দেখেই ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা কেমন, ব্যবহৃত উপকরণের মান কতটা ভালো, উপকরণের শক্তিমত্তা ঠিক আছে কি না—এসব যাচাই করার মতো সক্ষমতা আমাদের ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে দুর্নীতি ও অতিরিক্ত লাভের প্রবণতার কারণে অনেক জায়গায় নিম্নমানের ভবন নির্মিত হচ্ছে। এসব ভবন মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও ধসে পড়তে পারে।’
একই সঙ্গে তিনি পুরোনো ভবনগুলোর ঝুঁকির বিষয়েও সতর্ক করেন। তার মতে, দেশে অসংখ্য পুরোনো ভবন রয়েছে, যেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতার নির্ধারিত সময়সীমা ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশে বিপুলসংখ্যক ভবন জলাশয় ও জলাভূমি ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকার মাটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় অল্প মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। অথচ এসব জলাশয় ও জলাভূমি সংরক্ষণ করার কথা ছিল। প্রশ্ন হলো, কীভাবে বছরের পর বছর এসব এলাকা ভরাট করে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে? এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের ভূমিকম্পঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।
এসময় ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহরভিত্তিক সমন্বিত জরিপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন ছিল প্রতিটি শহরে ভবনভিত্তিক একটি সমন্বিত জরিপ (কমপ্রিহেনসিভ সার্ভে) করা। কোন ভবনের মান কেমন, কোনগুলোকে রেট্রোফিটিং করা সম্ভব, কোনগুলো নিরাপদ এবং কোনগুলো একেবারেই ঝুঁকিপূর্ণ—এসব তথ্য জানা জরুরি।’
অন্যদিকে লেখক, গবেষক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নাঈম ওয়ারা মনে করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ভবন নির্মাণ ও নগর ব্যবস্থাপনায়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ভূমিকম্প না হলেও অনেক বিল্ডিং পড়ে যাবে—এটা হলো সোজা কথা। ভূমিকম্পের দরকার হবে না। রানা প্লাজা পড়েছে; এ ধরনের বিল্ডিং ধসের সঙ্গে ভূমিকম্পের কোনো সম্পর্ক নেই। মূল সমস্যা হলো, আমরা বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করছি না। সে কারণে আমাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।’
তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প হবে কি হবে না, সেটা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমাদের বিদ্যমান ও নতুন নির্মাণাধীন ভবনগুলো যেন বিল্ডিং কোড মেনে, সঠিক জায়গায় এবং সঠিকভাবে নির্মিত হয়, তা নিশ্চিত করা।’
গওহার নাঈম ওয়ারা আরও বলেন, ‘আমাদের সবার আগে একটি ল্যান্ড ইউজ প্ল্যানিং করা দরকার—শহর ও গ্রাম, সব জায়গার জন্য। কোথায় বাড়িঘর হবে, কোথায় হবে না, তা নির্ধারণ করতে হবে।’
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, কোনটি নয়, তা চিহ্নিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে লাল পতাকা বা স্পষ্ট চিহ্ন দিতে হবে, যাতে মানুষ সেখানে না যায়।’
গওহার নাঈম ওয়ারা বলেন, ‘স্থানীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে পারে এলাকাভিত্তিক এসব ভবন চিহ্নিত করা। বিশ্বের যেসব দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভালো, সেখানে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী। তাই আমাদেরও এই দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে দিতে হবে।’
এই মুহূর্তে কী করতে পারে সরকার
বিভিন্ন অনিয়মের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা নগরীতে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে হতে পারে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি। সেক্ষেত্রে সরকারের এই মুহূর্তে করনীয় বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কার্যকর নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সরকারের করণীয় সম্পর্কে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই মুহূর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শহরভিত্তিক একটি সমন্বিত জরিপ পরিচালনা করা। কোন ভবনের অবস্থা কী, কোনগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোনগুলোতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার—সেসব চিহ্নিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ভবন মালিকদের বিস্তারিত ইঞ্জিনিয়ারিং মূল্যায়ন করতে বাধ্য করতে হবে এবং যেসব ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো অপসারণ বা ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
পাশাপাশি ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র, কমিউনিটি ওপেন স্পেস এবং আশ্রয়স্থল প্রস্তুত রাখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহরের সব ধরনের ইউটিলিটি লাইন—গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা-সংযোগ—নিয়মিত পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। কারণ ভূমিকম্পের সময় গ্যাস লাইনে লিকেজ বা বিদ্যুৎ লাইনের ত্রুটির কারণে অগ্নিকাণ্ডের বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
অপরদিকে গওহার নাঈম ওয়ারা সরকারের করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারের উচিত বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং মানুষকে সম্পৃক্ত করে কাজ করা।’
তিনি বলেন, ‘মানুষ জানে তাদের এলাকায় কী হচ্ছে। তারা রিপোর্ট করতে পারে—কোন ভবন সঠিকভাবে নির্মাণ হচ্ছে না, কোথায় নিয়ম মানা হচ্ছে না। এলাকাভিত্তিক, ওয়ার্ডভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ঢাকায় ভূমিকম্প-সহনশীল ৪৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের
এদিকে সরকার ঢাকায় ভূমিকম্প-সহনশীল ৪৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘ভূমিকম্প ও অন্যান্য দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৫৬ ও উত্তর সিটি এলাকায় ১৮৯ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভূমিকম্প-সহনশীল আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণার জন্য ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখার জন্য একটি সমন্বিত ভলান্টিয়ার ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে ভূমিকম্প ও সুনামি পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত তথ্য প্রচারের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প ও সুনামি-প্রবণ অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় প্রস্তুতি ও ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে চলার বিষয়টিও কঠোরভাবে জোরদার করা হচ্ছে।’



