প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নে কর সংস্কারের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তামাকমুক্ত বাংলাদেশে কর সংস্কারের আহ্বান

বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য খাতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করলেও অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে তামাকজনিত রোগ, দেশের জন্য একটি নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে অকালমৃত্যুবরণ করেন। ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অসংখ্য রোগের অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। লাখ লাখ পরিবার চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকালমৃত্যুর কারণে আর্থিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকের কারণে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি তামাক থেকে অর্জিত সরকারি রাজস্বের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের অগ্রগতি

তবুও বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের অন্যতম অগ্রগামী দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার Framework Convention on Tobacco Control (WHO FCTC)-এ স্বাক্ষরকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। জনস্বাস্থ্যের ইতিহাসে এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম আইনগত বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা আজ বিশ্বের প্রায় সব দেশ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের (২০০১–২০০৬) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তৎকালীন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল WHO FCTC-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। সেই প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য হিসেবে অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেনও এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বিএনপি সরকারের সময়ই ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ প্রণীত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নির্বাচনি অঙ্গীকার ও বাজেটের অসামঞ্জস্য

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। এটি একটি যুগান্তকারী, বিজ্ঞানসম্মত এবং জনস্বাস্থ্যবান্ধব প্রতিশ্রুতি। এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রথম ও সবচেয়ে কার্যকর সুযোগ এসেছে জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রস্তাবিত বাজেটে তামাক কর কাঠামোতে এমন কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বর্তমানে নিম্নস্তরের সিগারেটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ টাকা এবং মধ্যমস্তরের ৯২ টাকা (প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেট)। অথচ বাস্তবে বাজারে এই সিগারেট যথাক্রমে প্রায় ৭০ টাকা এবং ১০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার কর আদায় করছে কম মূল্যের ভিত্তিতে, কিন্তু ভোক্তা ইতোমধ্যেই বেশি মূল্য পরিশোধ করছেন। এই ব্যবধানের ফলে সরকার প্রতিবছর আনুমানিক ৫,৫১২ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা কার্যত তামাক কোম্পানির অতিরিক্ত মুনাফায় পরিণত হচ্ছে।

কর সংস্কারের প্রস্তাব

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিম্নস্তরের সিগারেটের সরকারি মূল্য ৬২ টাকার পরিবর্তে ৭০ টাকা এবং মধ্যম স্তরের মূল্য ৯২ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকা নির্ধারণ করলে সাধারণ ভোক্তার ওপর নতুন কোনো মূল্যবৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হবে না। কারণ বাজারে ইতোমধ্যেই এই দামেই সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। বরং এই একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার অতিরিক্ত ৫,৫১২ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করতে পারবে এবং তামাক কোম্পানির অযৌক্তিক অতিরিক্ত মুনাফা কমে যাবে।

এর পাশাপাশি সময়োপযোগী তামাক কর সংস্কারের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে Specific Excise Tax ব্যবস্থা চালু করা, কর কাঠামো সরল করা এবং মূল্যস্তরের সংখ্যা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের কর কাঠামো রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ধূমপান হ্রাস—উভয় ক্ষেত্রেই অধিক কার্যকর। অতিরিক্ত রাজস্ব স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, ক্যানসার প্রতিরোধ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান

অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন তার কলামে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “বাংলাদেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে একসময় বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আজ আবারও একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এসেছে। নির্বাচনি ইশতেহারে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, এখন সময় এসেছে সেটিকে বাজেট ও নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়ার।”

তিনি আরও বলেন, “এই পদক্ষেপ কেবল রাজস্ব বাড়াবে না; এটি লাখো মানুষের জীবন রক্ষা করবে, তরুণ প্রজন্মকে ধূমপান থেকে নিরুৎসাহিত করবে এবং ২০৪০ সালের তামাকমুক্ত বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের পথকে আরও সুগম করবে।”

স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ এবং জনগণের প্রতি অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় তিনি প্রত্যাশা করেন, বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিগারেটের করযোগ্য মূল্য পুনর্নির্ধারণ, তামাক কর কাঠামোর সংস্কার এবং শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও বিশ্বের সামনে একটি উদাহরণ সৃষ্টি করবে। তামাকমুক্ত বাংলাদেশ শুধু একটি স্বপ্ন নয়; এটি একটি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক নীতি এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।