তীব্র গরমের সময় শুধু অস্বস্তিই নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে কিছু সহজ ও কার্যকর অভ্যাসের মাধ্যমে ঘর এবং শরীরকে তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলেই গরমের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। নিচে বিশেষজ্ঞদের দেওয়া এমনই ছয়টি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরামর্শ দেওয়া হলো।
১. ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করান এবং বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন
ঘরের বিপরীত দিকের জানালা খুলে দিন, যাতে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে। এতে ভেতরে আটকে থাকা গরম বাতাস বের হয়ে যাবে এবং বাইরে থেকে তুলনামূলক ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করবে। এই কাজটি তখনই করা উচিত যখন বাইরে তাপমাত্রা ভেতরের তুলনায় কম থাকে—সাধারণত রাতে বা ভোরের দিকে। যেসব ফ্ল্যাটে শুধু এক পাশেই জানালা থাকে, সেখানে বাতাস চলাচল বাড়াতে দরজা খুলে রেখে ফ্যান ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের ভেতরে গরম বাতাস সাধারণত ওপরে উঠে যায়, তাই যদি ছাদের নিচের অংশে (লোফট ভেন্ট) বা জানালা থাকে, সেগুলো খুলে দিলে জমে থাকা তাপ সহজে বের হয়ে যেতে পারে। অনেক সময় দ্বিতীয় তলায় গরম বাতাস আটকে থাকে, বিশেষ করে যেখানে আপনি ঘুমান, ফলে অস্বস্তি বেড়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত ইনসুলেশন ব্যবহার করলে গ্রীষ্মকালে ঘরের ভেতর তাপ প্রবেশ কম হয় এবং শীতকালে এটি তাপ ধরে রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারও কমাতে সাহায্য করে।
২. দিনের বেলায় গরম বাতাস ঘরে ঢুকতে না দেওয়া
দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে জানালা বন্ধ রাখা সবচেয়ে ভালো। পাশাপাশি ব্লাইন্ড বা পর্দা টেনে রাখা উচিত—বিশেষ করে যে দিক থেকে সূর্যের আলো সরাসরি ঘরে পড়ছে। এতে বাইরে থেকে গরম বাতাস ও সূর্যের তাপ ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারে না, ফলে ঘর তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে।
৩. বাতাসের প্রবাহ বাড়াতে ফ্যান ব্যবহার করুন
ফ্যান একটি তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী উপায়, যা ঘরের ভেতরে বাতাস চলাচল বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি বাতাসকে ঘুরিয়ে দিয়ে শরীরকে ঠান্ডা অনুভব করায় এবং গরমের অস্বস্তি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এনার্জি সেভিং ট্রাস্টের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি ফ্রি-স্ট্যান্ডিং ফ্যান ২৪ ঘণ্টা চালাতে সাধারণত প্রায় ২২ টাকা থেকে ৪৭ টাকা খরচ হয়। ফ্যানটি খোলা জানালার সামনে রাখলে, যদি বাইরে তাপমাত্রা ভেতরের তুলনায় কম থাকে, তাহলে বাইরের ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে। এছাড়া ফ্যানের সামনে বরফের টুকরা রাখলে বাতাস আরও ঠান্ডা অনুভূত হয়, যা সরাসরি শরীরকে স্বস্তি দেয়। একাধিক ফ্যান ব্যবহার করে ক্রস-এয়ারফ্লো তৈরি করলেও ঘরের ভেতরের তাপ কমে।
পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইক টিপটন বলেন, “মুখে বাতাস দিলে আরামদায়ক অনুভূতি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, তবে পুরো শরীরে বাতাস লাগালে শরীরের তাপমাত্রা কমাতে আরও বেশি সহায়তা করে।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তাপমাত্রা যদি ৩৫° সেলসিয়াসের বেশি হয়, তাহলে ফ্যান ব্যবহার পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে, কারণ তখন ফ্যান শুধু গরম বাতাসই শরীরের দিকে প্রবাহিত করে। অন্যদিকে, এয়ার কন্ডিশনিং ফ্যানের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল একটি বিকল্প। এনার্জি সেভিং ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টা একটানা এয়ার কন্ডিশনার চালাতে খরচ হতে পারে প্রায় ৭২৫ টাকা থেকে ৯০০ টাকা (আনুমানিক)।
৪. গরম সৃষ্টি করে এমন কাজ সীমিত করুন
ওভেন ও কুকার ব্যবহার করার সময় এবং ব্যবহারের পর ঘরের ভেতরে অনেক তাপ ছড়িয়ে পড়ে। তাই দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে সালাদের মতো ঠান্ডা খাবার খাওয়ার অভ্যাস করলে অপ্রয়োজনীয় তাপ উৎপাদন এড়ানো যায়। এছাড়া ওয়াশিং মেশিন ও ডিশওয়াশারের মতো অন্যান্য গৃহস্থালি যন্ত্রও তাপ তৈরি করে, তাই তাপমাত্রা বেশি থাকাকালীন সময়ে এগুলোর ব্যবহার সীমিত রাখা ভালো। উচ্চ আর্দ্রতা (বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প) হিট এক্সহস্টশন বা তাপজনিত ক্লান্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ঘরের আর্দ্রতা কমিয়ে রাখাও জরুরি। এর জন্য কিছু উপায় হলো—সংক্ষিপ্ত সময়ের এবং ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা, ঘরের ভেতরের পৃষ্ঠে জমে থাকা অতিরিক্ত পানি মুছে ফেলা, এবং ঘরের ভেতরের গাছপালা বাইরে রাখা। এগুলো অনুসরণ করলে ঘরের আর্দ্রতা কমে এবং শরীর তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে থাকে। হিট এক্সহস্টশন সাধারণত গুরুতর নয়, যদি দ্রুত শরীরকে ঠান্ডা করা যায়। তবে হিটস্ট্রোক একটি চিকিৎসা জরুরি অবস্থা, যার জন্য দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। যদি কারও হিটস্ট্রোক হয়েছে বলে সন্দেহ হয়, তাহলে অবিলম্বে ৯৯৯ নম্বরে কল করুন।
৫. শরীরকে ঠান্ডা রাখুন
কুসুম গরম (tepid) পানিতে গোসল করা শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং এতে খরচ ও শক্তির ব্যবহারও কম হয়। তবে অধ্যাপক টিপটন সতর্ক করে বলেন, খুব ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা ঠিক নয়। তার মতে, “মূল কৌশল হলো ত্বককে যতটা সম্ভব ঠান্ডা রাখা, তবে একই সঙ্গে সেখানে সর্বোচ্চ রক্তপ্রবাহ বজায় রাখা।” “অতিরিক্ত ঠান্ডা হলে শরীর ত্বকে রক্ত চলাচল কমিয়ে দেয় এবং শরীরের ভেতরে তাপ আটকে রাখে, ফলে তা বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।” শরীরে আইস প্যাক বা ঠান্ডা পানির বোতল ব্যবহার করলে তা তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে এটি সরাসরি ত্বকে না রেখে একটি তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে ব্যবহার করা উচিত। আপনার পরিধেয় পোশাকও শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কটন ও লিনেনের মতো প্রাকৃতিক কাপড় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ঢিলেঢালা পোশাক বাতাস চলাচলের সুযোগ তৈরি করে, ফলে হালকা বাতাস শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে। এ কারণেই গরমের সময় ঘরে উষ্ণ বাতাস থাকলেও কটনের চাদর ব্যবহার করলে ঘুমাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়।
৬. বিকল্প শীতল স্থান খুঁজে নিন
যদি আপনার ঘর খুব বেশি গরম হয়ে যায়, তাহলে এয়ার কন্ডিশনযুক্ত পাবলিক ভবন যেমন লাইব্রেরি, লিজার সেন্টার বা শপিং সেন্টারে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে।



